টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নদ-নদীর পানি বেড়েছে। এতে তলিয়ে গেছে নিচু এলাকার বিস্তীর্ণ বোরো ধানের জমি। অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট ভেঙে দ্রুতবেগে হাওরে পানি প্রবেশ করায় আকস্মিক বন্যায় বছরের একমাত্র বোরো ফসল হারিয়ে চরম সংকটের মুখে পড়েছেন জেলার হাজারো কৃষক।
বুধবার বানিয়াচং উপজেলার সুজাতপুরের দত্তগাঁও অংশে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ও উপচে পানি হাওরে প্রবেশ করতে শুরু করে। ফলে মুহূর্তের মধ্যে শত শত একর ফসলি জমি প্লাবিত হয়। তবে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে আকাশে রোদ দেখা দেওয়ায় কৃষকের মুখে কিছুটা হলেও হাসি ফুটেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার ৯টি উপজেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৪৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন। তবে গত কয়েক দিনের মুষলধারে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের আকস্মিক বন্যায় ৩ হাজার ৬৪ হেক্টর ধানি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরে এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ ধান কাটার বাকি রয়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টি হলে অবশিষ্ট ধানও তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার বিভিন্ন হাওরে চোখের সামনে ভেসে গেছে ফসল। জমিতে বুক সমান পানি থাকায় ধান কাটতে গিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন কৃষকেরা। অনেক জমিতে বাতাসের তীব্রতায় ধান গাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ায় ফসল সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত শ্রম ও সময় লাগছে। হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক তাদের পাকা ধান ঘরে তুলতে পারেননি। ছোট নৌকা ব্যবহার করে ডুবন্ত জমি থেকে ধান উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। কৃষকদের দাবি, জেলায় এখনো ৫০ শতাংশ জমির ধান কাটা বাকি রয়েছে।
বানিয়াচংয়ের সুবিদপুরের কৃষক আলমগীর মিয়া টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘১৬ বিঘা জমি চাষ করেছিলাম। মাত্র ৫ বিঘা জমির ধান ঘরে তুলতে পেরেছি। বাকি সবটুকু এখন পানির নিচে। নৌকা নিয়ে কিছু ধান কাটার চেষ্টা করছি’।
কাবিলপুর গ্রামের রফিক আলী বলেন, ‘এ বছর ১০ বিঘা জমির ধান চাষ করতে আমার প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ধান আধা পাকা অবস্থায় জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। লাভের আশায় ধান চাষ করে সবটুকুই জলে গেল।’
একই পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে লাখাইর স্বজনগ্রামের কৃষক সুশিল দাস বলেন, ‘লাভের আশায় ধান চাষ করেছিলাম। স্বপ্ন ছিল বছরের খাওন রেখে কিছু ধান বিক্রি করে দেনা পরিশোধ করবো। কিন্তু আমার স্বপ্ন এখন পানিতে ডুবে গেল, খাওনতো দূরের কথা কিভাবে দেনা পরিশোধ করবো বুঝতে পারছি না।’
বন্যায় জেলার চুনারুঘাট ও লাখাইর কয়েকটি এলাকায় রাস্তা ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পুরাতন ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চুনারুঘাট উপজেলার রামগঙ্গা ও চন্ডী এলাকায় রাস্তা ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। রামগঙ্গা ব্রিজের কাছে রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, লাখাইর বলভদ্র সেতুর এপ্রোচে ধস দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘টানা বৃষ্টির ফলে রাস্তা ভেঙে রামগঙ্গায় বড় আকারের গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা চারপাশে বালু ভর্তি বস্তা দিয়ে চিহ্নিত করে রেখেছি যাতে দুর্ঘটনা না হয়।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ারুল হক বলেন, ‘ভারী বৃষ্টির ফলে ইতোমধ্যে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর ধানি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। হাওরে এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ ধান কাটতে বাকি রয়েছে। কৃষকদের আগাম সতর্ক করা হয়েছিল’।
আগামী ২৪ ঘণ্টা বৃষ্টি হলে অবশিষ্ট জমির ধানও তলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, পানি দ্রুত গতিতে বাড়লেও এখনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে।
বানিয়াচংয়ে খোয়াই নদীর বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে তিনি এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ চিহ্নিত করে দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হবে’।


