দেশের স্বাস্থ্য খাতে কেবল বাজেট বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং সেই অর্থের কার্যকর ও সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মত দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্নীতি, জনবল সংকট ও সমন্বয়হীনতার কারণে স্বাস্থ্যসেবায় প্রত্যাশিত উন্নয়ন হচ্ছে না।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘স্বাস্থ্য বাজেট: অধিক বরাদ্দ ও সঠিক বাস্তবায়নের প্রত্যাশা’ শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তারা। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাব্লিক ইন্টিগ্রিটি নেটওয়ার্ক ফর ইভিডেন্স অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সি (পাইনেট)।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় এখনো জিডিপির ১ শতাংশেও পৌঁছায়নি। ফলে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ জনগণকে নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘দেশে স্বাস্থ্য খাতে প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ৮০ টাকাই মানুষকে নিজ খরচে দিতে হয়। ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ অর্জন করতে হলে এ ব্যয় ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে।’
আলোচনায় উঠে আসে, গত অর্থবছরে প্রায় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ পেয়েছিল ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু বছর শেষে সেই বরাদ্দের বড় অংশই খরচ করা যায়নি।
অধ্যাপক হামিদের মতে, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, সরকারি ক্রয় আইনের জটিলতা, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ, নিরীক্ষা ও হিসাব অফিসে দুর্নীতি এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপকদের সীমিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতার কারণে স্বাস্থ্য খাতের অর্থ যথাসময়ে ব্যয় করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, ‘কাজ না করলেই যেন নিরাপদ থাকা যায়, এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতের ক্রয়ব্যবস্থা অবকাঠামো নির্মাণকেন্দ্রিক হওয়ায় বাস্তব স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনের সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছায় না। কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও অপারেটর নেই, আবার কোথাও সার্জন থাকলেও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ নেই। ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে বিপুল পরিমাণ ওষুধ নষ্ট হচ্ছে বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠন করা স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আবু মুহাম্মদ জাকির হোসাইন বলেন, ‘অনেক হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল নেই। যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা করে অন্তত ১৫ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ দরকার।’
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ শাদরুল আলম বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়কে শুধু খরচ হিসেবে দেখলে হবে না, এটিকে জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।’তিনি স্বাস্থ্য বিমা ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তার মতে, স্বাস্থ্য ব্যয়ের কারণে প্রতিবছর বহু মানুষ আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছে।
টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের মাত্র ৩০ শতাংশ ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘অর্থের অভাবই মূল সমস্যা নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।’
বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, ‘উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ প্রতিবছর ফেরত চলে যায়, কারণ নির্ধারিত সময়ে সেই অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয় না। বাজেট পাস হওয়ার পর বরাদ্দ হাতে পেতে ডিসেম্বর-জানুয়ারি পর্যন্ত সময় লেগে যায়। এরপর দরপত্র ও নির্মাণকাজ শুরু হতে আরও দেরি হয়। ফলে অনেক প্রকল্পের কাজ শুরু করতেই দুই থেকে তিন বছর কেটে যায়।’
স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘গত এক মাসে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে অন্তত ২৮টি সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।’
সংসদ সদস্য মোসলেহউদ্দিন ফরিদ বলেন, ‘দেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে নার্সের সংখ্যা মাত্র পাঁচজন, যা অত্যন্ত অপ্রতুল।’
তার মতে, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষা কমানো গেলে মানুষের অর্থনৈতিক চাপ অনেকাংশে কমবে।


