আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দৃশ্যপট উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির তুলনায় জামায়াতে ইসলামী বেশ আগেভাগেই মাঠে নেমে পড়েছে। জামায়াত ইতিমধ্যে তাদের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করে তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে বিএনপি এখনো পরিকল্পনা এবং আলোচনার স্তরেই আটকে আছে।
ইতিমধ্যে উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্তরগুলোতে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার করেছে জামায়াত। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, তৃণমূল থেকে শুরু করে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং জেলা পর্যায়ে তা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সুশৃঙ্খল এবং সমন্বিত এই আগাম প্রচারণার মূল লক্ষ্য ভোটারদের দোরগোড়ায় পৌঁছানো এবং তৃণমূলের সাথে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করা।
বিপরীতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বিএনপি এখনো দৃশ্যমান কোনো প্রস্তুতি নিতে পারেনি। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, বড় ব্যবধানে জিতে সরকার গঠনের পর তারা বর্তমানে অর্থনীতি সামলানো, জ্বালানি সংকট নিরসন এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। এছাড়া রমজান, ঈদুল ফিতর এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তারা স্থানীয় নির্বাচনের দিকে পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারেননি।
বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা এই বিলম্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, দ্রুত ভোটারদের সাথে সংযোগ স্থাপন এবং দলীয় কাঠামো শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি।
গত সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৮০টি আসনে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে বিএনপিতে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ বিভেদ এখনো কাটেনি, যা দলের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় নেতারা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দ্রুত এই কোন্দল মেটানো না গেলে স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের জন্য জয় পাওয়া কঠিন হবে। সংসদ নির্বাচনেও অনেক জায়গায় বিএনপির ভোট কাটাকাটির সুযোগ নিয়ে জামায়াত ভালো ফলাফল করেছে বলে তারা মনে করেন।
খুলনা বিভাগের বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার অঞ্চলের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতেই জামায়াত জয়ী হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল বিএনপির সঠিক প্রার্থী বাছাই ও ঐক্যের অভাব। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সাংগঠনিক দুর্বলতা দূর করতে না পারলে স্থানীয় নির্বাচনেও একই ফলাফলের পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এই বিলম্বের কথা স্বীকার করে বলেন, ক্ষমতায় আসার পর দলীয় নেতৃত্ব রাষ্ট্রীয় কাজে বেশি সময় দিচ্ছে। তবে বর্তমানে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে দলের মধ্যে আলোচনা গতি পেয়েছে। শিগগিরই তৃণমূলকে গুছিয়ে আনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
অন্যদিকে জামায়াত তাদের কৌশলের মূল ভিত্তি হিসেবে মানুষের সেবা এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মুখপাত্র এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, তাদের প্রার্থীরা ইতিমধ্যে মাঠে নেমে পড়েছেন। সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ শুরু করেছেন।
তিনি আরও জানান, সংসদ নির্বাচন জোটবদ্ধভাবে হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিটি দল স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ হলেও উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগের গুঞ্জন নাকচ করে দিয়েছে সরকার। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, এসব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগের কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা হবে কি না সেই সিদ্ধান্ত তফসিল ঘোষণার আগেই জানানো হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের স্থানীয় নির্বাচন সাধারণত ব্যক্তি-নির্ভর ও আঞ্চলিকতা-নির্ভর হয়। একারণে তৃণমূল পর্যায়ে আগাম প্রচারণা জামায়াতকে কৌশলগতভাবে এগিয়ে রাখছে। তবে বিএনপি যদি দ্রুত তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে তৃণমূলকে সক্রিয় করতে পারে তবে এই হিসাব বদলে যেতে পারে।


