দুই দিনের তীব্র বিক্ষোভের পরও শান্ত হয়নি নেপালের ছাত্র-জনতা। বুধবার সকাল থেকে তৃতীয় দিনের মতো সেখানে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ চালানো হয়েছে সরকারি স্থাপনা, সংসদ ভবন, প্রভাবশালী নেতাদের বাসভবন এমনকি নেপালের কান্তিপুর টিভির হেডকোয়ার্টারে।
নেপালের প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পাওডেল ‘জেন জি’ আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য বুধবার আন্দোলনরতদের সঙ্গে সংলাপের ডাক দেন। তাতেও দমেনি আন্দোলন।
পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে গেলে, মঙ্গলবার সন্ধ্যায়ই নেপালের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব নিয়ে নেয় দেশটির সেনাবাহিনী। এদিন আন্দোলনকারীরা কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে নেপালের সেনাবাহিনী বিমানবন্দরেরও নিয়ন্ত্রণ নেয়।
তীব্র বিক্ষোভের মুখে ইতোমধ্যে আংশিকভাবে স্থগিত রয়েছে ত্রিভুবন বিমানবন্দরের ফ্লাইট চলাচল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশজুড়ে করফিউ জারি করেছে সেনাবাহিনী।
দ্য হিমালয়ান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার পর মঙ্গলবার রাতে সংলাপের ডাক দেন প্রেসিডেন্ট পাওডেল। সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি দলের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে তার বৈঠক করার কথা রয়েছে।
এক বিবৃতিতে তিনি রক্তপাত বা ধ্বংস ছাড়াই আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমি সব পক্ষকে শান্ত থাকার, দেশের আর ক্ষতি না করার এবং আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানাচ্ছি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের উত্থাপিত দাবি-দাওয়া সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব।’

বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন নেপালের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল অশোক রাজ সিগদেল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়েনের পর মঙ্গলবার গভীর রাতে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভ চলাকালে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আরও ক্ষতি না করে, শান্তি, নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি বজায় রাখতে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।’
জেনারেল সিগদেল তার বক্তব্যের শুরুতেই দেশব্যাপী বিক্ষোভে ১৯ জনের প্রাণহানির ঘটনায় শোক জানান এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। আন্দোলনের কর্মসূচি বাতিল করে আলোচনায় বসার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘বর্তমান অস্বস্তিকর পরিস্থিতি প্রশমিত করা, জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা, সরকারি-বেসরকারি সম্পদ, সাধারণ নাগরিক ও কূটনৈতিক মিশনগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া এবং জনগণের মনে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা ও রাষ্ট্রের সার্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের যৌথ দায়িত্ব।’

দুর্নীতি ও ২৬টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে গত সোমবার থেকে বিক্ষোভে ফুঁসে ওঠে নেপাল। ছাত্র জনতার সে আন্দোলন পুলিশি বাধা মুখে পড়লে সহিংসতায় রূপ নেয়। এতে প্রাণ হারান মোট ২২ বিক্ষোভকারী।
এমন অবস্থায় নতুন করে গতি পায় আন্দোলন। সহযোদ্ধাদের হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে কাঠমান্ডুর রাজপথ। পরিস্থিতি সামাল দিতে সে রাতেই মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ সব সামাজিক মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দেন দেশটির তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী।
তবুও বিক্ষোভ না থামায় আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে গত মঙ্গলবার দুপুরে পদত্যাগ করেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ওলিসহ একাধিক মন্ত্রী। এরপরও রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়ান বিক্ষোভকারীরা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় সংসদ ভবন। আগুন দেওয়া হয় মন্ত্রীদের বাড়িঘরে।
আন্দোলনকারীরা প্রধান সচিবালয় ভবন সিংহদরবার কমপ্লেক্সের ভেতরে আগুন ধরিয়ে দিলে সেনারা বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিয়ে ওই ভবনেরও নিয়ন্ত্রণ নেয়। মন্ত্রীদের সরিয়ে নেওয়া হয় হেলিকপ্টারে করে। দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় নিয়মিত পেট্রল পরিচালনা করছে সেনাবাহিনী।


