চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে, নয় শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনায় শিপব্রেকিং খাতের কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা এবং তদারকি সংস্থার তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গ্রিন শিপইয়ার্ড হিসেবে কারখানাটি পরিচালিত হলেও সরকারি নজরদারিতে একাধিকবার নিরাপত্তাজনিত ঘাটতি ধরা পড়ায়, নোটিশ প্রদান এবং আদালতে মামলার পরও কারখানাটি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করায় ক্ষোভ জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর চট্টগ্রাম (ডিআইএফই) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ফেরদৌস স্টিল পরিদর্শন করে ডাইফের একটি দল। এ সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তা সামগ্রীর অভাব, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের ঝুঁকি মূল্যায়ন (রিস্ক এসেসমেন্ট) না করা, নির্ধারিত ঘণ্টার অতিরিক্ত কাজ করিয়ে ওভারটাইম না দেওয়া এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও কাজ করানোর মতো নানা অনিয়ম ধরা পড়ে।
ডাইফের পক্ষ থেকে একাধিক নোটিশ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি কোনো সন্তোষজনক জবাব দেয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডাইফ চট্টগ্রাম কার্যালয়ের শ্রম পরিদর্শক শাহেদ পারভেজ বাদী হয়ে গত জুলাই মাসে শ্রম আদালতে প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে মামলা করেন।
কিন্তু আদালত পর্যন্ত মামলা গড়ালেও কারখানার কাজের ক্ষেত্রে কোনো নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা জোরালো করা হয়নি।
ডাইফ জানিয়েছে, শিপ ব্রেকিং খাতের কাজের নিরাপত্তা ও কারিগরি জটিলতা সাধারণ পরিদর্শন আওতার বাইরে থাকায় বিষয়টি এখন উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল তদন্ত করছে। শিপ ব্রেকিং বা জাহাজ ভাঙা খাতের সেইফটি ও কমপ্লায়েন্স সাধারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভিন্ন ও অত্যন্ত উচ্চ কারিগরি ভিত্তিক।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, চট্টগ্রামের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ডাইফ সাধারণত কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের প্রাথমিক নিরাপত্তা সামগ্রী- যেমন হ্যান্ডগ্লাভস, মাস্ক বা বুট ব্যবহার হচ্ছে কি না কিংবা পরিদর্শনের শিডিউল কমপ্লায়েন্স ঠিক আছে কি না তা তদারকি করে। তবে জাহাজ কাটার আগে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস নির্গমন পরীক্ষা এবং পরিবেশ ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের ছাড়পত্র সম্পর্কিত বিষয়টি অত্যন্ত বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কারিগরি কাজ, যা অধিদপ্তরের সাধারণ তদারকির আওতাভুক্ত নয়।’
তিনি উল্লেখ করেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া জাহাজ কাটার কথা নয় এবং এর জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ রয়েছে।
এর আগে, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পরিদর্শনের ভিত্তিতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের বিভিন্ন প্রাথমিক নিরাপত্তা ত্রুটি ও কমপ্লায়েন্সের অভাব চিহ্নিত করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক শাহেদ পারভেজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শিডিউল মামলাও করা হয়।
উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান আরও নিশ্চিত করেন যে, দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান শনিবার সকালে দুর্ঘটনাকবলিত স্থান পরিদর্শন করেছেন। বর্তমানে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি পুরো ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে। কারিগরি ত্রুটি, পরিবেশ ও বিস্ফোরক ছাড়পত্রের সততা এবং মালিকপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কাদের গাফিলতি রয়েছে— সে বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এর আগে, শুক্রবার সকালে ইয়ার্ডে ‘এমটি রাসি’ নামের ৩০ হাজার ৭৭০ টন ওজনের একটি স্ক্র্যাপ এলএনজি বাহক জাহাজ কাটার সময় কার্গো ট্যাংকের পাশে ব্যালাস্ট অংশে এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ব্যালাস্ট অংশে ছড়িয়ে থাকা বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের ফলেই একের পর এক শ্রমিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এতে ওই কারখানার ছয় শ্রমিক এবং তাদের উদ্ধার করতে যাওয়া আশপাশের এলাকার তিন বাসিন্দাসহ মোট নয় জন প্রাণ হারান।

আগেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল এই শিপ ইয়ার্ডে
ফেরদৌস স্টিলে দুর্ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর ওপর থেকে পড়ে খলিলুর রহমান নামের এক শ্রমিক এবং ২০২৩ সালে বিদ্যুতায়িত হয়ে বাবু নামের আরেক শ্রমিক নিহত হন।
একই কারখানায় বারবার অনিয়ম ও মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের আহ্বায়ক ও শ্রম সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য তপন দত্ত বলেন, ‘ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে সেফটি সিকিউরিটি ও নিরাপত্তা আইন তোয়াক্কা না করে কাজ করানোর ফলে বিষাক্ত গ্যাসে নয় শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও কোনো প্রকার অতিরিক্ত ভাতা (ডাবল বেতন) বা নিয়ম অনুযায়ী বিকল্প ছুটি (কম্পেনসেটরি ছুটি) না দিয়ে সাধারণ বেতনে ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত শ্রমিকদের কাজ করানো হচ্ছিল। ইয়ার্ড বন্ধ থাকার কথা থাকলেও শুধু কাটিং কাজের জন্য ৩০-৩৫ জন শ্রমিককে বিষাক্ত জাহাজে ঢুকানো হয়। এমনকি সেখানে থাকা সেফটি অফিসারও শ্রমিকদের নিরাপত্তা না দেখে মালিকের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিজে মারা গেছেন।’
তপন দত্ত অভিযোগ করেন, কলকারখানা পরিদর্শন পরিদপ্তর এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে বারবার এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে। শ্রম আইনে সর্বোচ্চ শ্রম আদালতে মামলা হলেও সেখানে সামান্য জরিমানাতেই ছাড় পেয়ে যান মালিকেরা। এ যাবৎকালে কোনো মালিকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা ফৌজদারি ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কলকারখানা পরিদর্শকরা মামলা দিয়েই দায় শেষ করেন, কিন্তু পরবর্তীতে কোনো ফলোআপ করেন না।
ঘটনার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেশ কয়েকজনের মরদেহ নেওয়া হলেও মালিকপক্ষ কৌশল করে পোস্টমর্টেম ঠেকানোর চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার মতে, পোস্টমর্টেম হলে ও বিষাক্ত গ্যাসের প্রমাণ সামনে এলে মালিকদের কারাদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়। পরবর্তীতে লোভনীয় ক্ষতিপূরণ বা সামান্য টাকার প্রলোভন দিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোকে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর থেকে পাওয়া চট্টগ্রামের তথ্য অনুযায়ী গত ৯ ফেব্রুয়ারি কারখানাটি পরিদর্শন করেছিলেন তারা। তখন নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধাসংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম পাওয়া যায়। এরপর ধাপে ধাপে নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি যথাযথ জবাব দেয়নি। শেষ পর্যন্ত জুলাইয়ে শ্রম আদালতে মামলা করা হয়। মামলায় প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার ফেরদৌস ওয়াহিদ ও ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলীকে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনার কারণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি ছিল, তা খুঁজে বের করতে ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, জাহাজের কার্গো ট্যাংকের পাশে থাকা ব্যালাস্ট এলাকায় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছিল। জাহাজের ভারসাম্য রক্ষার জন্য এই অংশে পানি ধারণ করা হয়। বিষাক্ত ওই গ্যাসের কারণেই শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার দুপুরে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমি এখন দুর্ঘটনাকবলিত স্থান পরিদর্শনে আছি। এ বিষয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত জানাবো।’
ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক ফেরদৌস ওয়াহিদ এর মোবাইল নম্বরে কল করা হলে, তা বন্ধ পাওয়া যায়।
নয়জনের প্রাণহানির ঘটনাকে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা দাবি করে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ আলী টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের ইয়ার্ডে সব ধরনের সেফটি ও আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করেই কাজ চালানো হচ্ছিল। কোনো প্রতিষ্ঠানই চায় না এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটুক।’
তিনি জানান, ঘটনার দিন ইয়ার্ডে ছুটির দিন ছিল এবং শ্রমিকরা হাউসকিপিংয়ের কাজ করছিলেন। জাহাজের ওয়াটার ব্যালাস্ট ট্যাংকের একটি ছিদ্র দিয়ে বের হওয়া পানির দুর্গন্ধ পরীক্ষা করতে গিয়েই মূলত এই দুর্ঘটনা ঘটে।
ব্যবস্থাপক ইউসুফ আলীর ভাষায়, ‘জাহাজটির বড় অংশের কাজ আগেই শেষ হয়েছিল। পার্শ্ববর্তী ট্যাংকগুলো থেকে পানি বের হওয়ার সময় দুর্গন্ধ ছড়ালে ডরমিটরিতে থাকা ফোরম্যান, ইনচার্জ ও সেফটি অফিসারকে খবর দেওয়া হয়। আমাদের সেফটি অফিসার আলিম সুজন নিজেই গ্যাস ডিটেক্টর ও মিটার নিয়ে ট্যাংকে নামেন পরীক্ষা করার জন্য। কিন্তু দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত বাতাসের কারণে তারা একের পর এক অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এমনকি তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে বাইরে থেকেও কয়েকজন ভেতরে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন।’
ইয়ার্ডের সেফটি ও অতীত রেকর্ড নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা গত এক বছর ধরে অত্যন্ত পরিশ্রম করে গ্রিন ইয়ার্ডের মান অর্জন করেছি। ২০২৬ সালেই আমরা গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ পেয়েছি। নিয়মিত অডিটররা এসে পরিদর্শনের পর আমাদের পর্যাপ্ত পিপিই (নিরাপত্তা সরঞ্জাম) ও প্রসেস অ্যাপ্রুভ করেছেন। ফলে নিরাপত্তা না থাকার অভিযোগ সঠিক নয়।’


