ঝিনাইদহের কৃষক নজরুল ইসলাম। চাষাবাদ করেই তার জীবন চলে। ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন ফুলের আবাদ করেন এই কৃষক। এ বছর সার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। ডিলারের কাছে একাধিক দিন ঘুরেও পর্যাপ্ত সার পাননি।
অভিযোগ করে তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আট বিঘা জমিতে ফুল ও ধানের চাষ করেছি। কিন্তু ডিলারের কাছে গেলে সকল সার মিলিয়ে আমাকে মাত্র ১০ কেজি সার বরাদ্দ দেওয়া হয়। কম সার দেওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে, সরকার থেকে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে তারা জানান।’
নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বাইরে থেকে বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে হলে চাষে লাভ করা যায় না। চাষের খরচের বড় অংশই সার কিনতে চলে যায়।’ শুধু ঝিনাইদহ নয়-লালমনিরহাট, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, দিনাজপুর, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একই অভিযোগ উঠেছে।
টাইমসের জেলা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জানা যায়, কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না। ডিলার ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেট সারের কৃত্রিম সংকট ও দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে আগে এক ও দুই ফসলি জমি বেশি থাকা জেলাগুলোর উদ্বৃত্ত সার অন্য জেলায় সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে সেটি আর করা যাচ্ছে না। ফলে যেসব জেলায় বেশি সার প্রয়োজন হয় সেখানে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ হচ্ছে না।
এ ছাড়া যেসব ফসল সরকারি বরাদ্দের আওতায় নেই, সেসব ফসলের চাষিরা বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। প্রতিনিধিরা আরও জানান, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন এক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা ডিলারদের কাছ থেকে অবৈধভাবে সারের একটি অংশ নিয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর তদারকি দুর্বল হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কৃষি কর্মকর্তা জানান, ফসলের ধরনের ভিত্তিতে সারের যে চাহিদা পাঠানো হয়, সেই অনুযায়ী বরাদ্দ পাওয়া যায় না। তামাকের জন্য সরকারি বরাদ্দ না থাকলেও কৃষকরা সার চান। এই সুযোগে কিছু ডিলার গোপনে তাদের কাছে বেশি দামে সার বিক্রি করে দেয়।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. নূর এ নবী জানান, তার জেলায় সারের সংকট নেই। তামাকচাষীদের কাছ থেকেই বেশি সার সংকটের অভিযোগ আসে। কারণ, তাদের জন্য বরাদ্দ না থাকলেও তারা সার চান। এ ছাড়া কিছু কৃষক প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার সংগ্রহ করেন। এতেও কিছুটা সমস্যা হয়।
কৃষি কর্মকর্তা নূর এ নবীর মতোই কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি দেশে পর্যাপ্ত সার মজুদ আছে। প্রতিবছর চাহিদা যখন বেশি থাকে, তখন অতিরিক্ত লাভের আশায় অসাধু কিছু ডিলার সারের কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করে। এ সমস্যা কাটাতে অসাধু ডিলারদের সিন্ডিকেট ভেঙে সুষ্ঠু সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার নতুন সার নীতিমালা বাস্তবায়ন করবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার যুগ্ম সচিব মো. খোরশেদ আলম টাইমসকে বলেন, ‘সার সংকটের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। মাঠে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার পাঠানো হচ্ছে। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সংকট তৈরি করে বা দাম বাড়ায়, স্থানীয় প্রশাসন সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে।’
আগামী জানুয়ারি পর্যন্ত যতটুকু সার প্রয়োজন, তা সরকারের গুদামেই মজুত আছে জানিয়ে তিনি বলেন, আরও সার আমদানি প্রক্রিয়াধীন। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত অনেক ডিলার পালিয়ে আছে-সেখানে সার কীভাবে বিতরণ করা হচ্ছে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যেসব স্থানে ডিলার নেই সেখানে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সার প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
সার ডিলারশিপ সংক্রান্ত একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলমান আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যেখানে ডিলার নেই সেখানে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে।’ এ ছাড়া, কৃষি উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীও বলেছেন, দেশে সারের কোনো সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।
মেহেরপুর জেলা বিসিআইসি সার ডিলার সমিতির সভাপতি হাফিজুর রহমান বলেন, জেলার সার সংকটের মূল কারণ হলো চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়া। এতে কৃষকরা প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহে ভোগান্তিতে পড়ছেন।
তিনি জানান, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে জেলার বাইরে থেকে সার এনে বেশি দামে বিক্রি করছে, যা বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। হাফিজুর রহমান বলেন, কৃষকদের স্বার্থে পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের তদারকি কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি, যাতে বাজারে স্বাভাবিকতা ফিরে আসে এবং কৃষকেরা সময়মতো সার পেতে পারেন।
এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলে ডিলাররা কারসাজি করার সুযোগ পায় না। যদি ডিলাররা কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরিই করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না কেন?’
তিনি মনে করেন, সরকারের সার ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো কাজ করছে না। কারণ, ডিলাররা ধরাছোঁয়ার বাইরের কেউ নয়। তিনি জানান, এভাবে যদি ডিলারের সমস্যা ও সরবরাহ না থাকে, তাহলে বোরো ফসলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হবে। ডিলারশিপ আইন দ্রুত প্রণয়নের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন আইনে ডিলারের সংখ্যা দ্বিগুণ বাড়াতে হবে, যা দ্রুত কার্যকর করলে সার সংকট কমবে।’
চলতি মৌসুমে সারের চাহিদা সবচেয়ে বেশি
দেশে সবচেয়ে বেশি সার প্রয়োজন হয় রবি মৌসুমে (নভেম্বর থেকে মার্চ)। এ সময় মোট বার্ষিক চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ সার ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া এই সময়েই কৃষকদের অভিযোগ ও সংকটের খবর বেশি আসে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশে রাসায়নিক সারের চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশই আমদানি নির্ভর। বাকি সারের চাহিদা মেটে দেশের কারখানাগুলোর মাধ্যমে। আমদানির বাইরে যে ২০ শতাংশ দেশে উৎপাদন হয়, এসব সার যোগান দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।


