বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে সহিংসতা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি নিয়মিত সামাজিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনি, ধর্মীয় উত্তেজনা, পারিবারিক নিপিড়ন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা এবং রাজনৈতিক সংঘাত—সব মিলিয়ে সমাজের ভেতরে জমে থাকা এক বহুমাত্রিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে।
ময়মনসিংহে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে দীপু চন্দ্র দাসকে গণপিটুনি ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা, পারিবারিক বিরোধের জেরে সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা চালিয়ে গলা কেটে মৃত ভেবে ফেলে যাওয়ার নির্মম ঘটনা সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
এছাড়া দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি সংবাদপত্র দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোতে হামলা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও উদীচী কার্যালয়ে সংঘবদ্ধ মব হামলা ও অগ্নিসংযোগ এবং শরীফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার মতো আলোচিত ঘটনাগুলো এই অস্থিতিশীল বাস্তবতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১৯৮ জন। রাজনৈতিক সহিংসতার ৪০১টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০২ জন, আহত হয়েছেন চার হাজার ৭৪৪ জন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৪৬টি এবং সাংবাদিক হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ৩৮১টি।
একই সময়ে দেশে ৫৬০টি গৃহস্থালি সহিংসতা ও ২৩০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে এক হাজার ২৪টি।
নতুন বছর ২০২৬ সালেও এই পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক বদল দেখা যায়নি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে মাত্র এক মাসেই গৃহস্থালি সহিংসতার ৩১টি, ধর্ষণের ৩৫টি, শিশু নির্যাতনের ৩৫টি এবং মব সহিংসতায় মৃত্যুর ১৪টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ৭৫টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬১৬ জন ও নিহত হয়েছেন ১১ জন। এছাড়া ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ১৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ জন এবং সাংবাদিক হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ১৬টি।
এই সংখ্যাগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে, সহিংসতা কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্র বা শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ নেই। পরিবার থেকে রাজনীতি, ধর্মীয় সম্পর্ক থেকে জনপরিসর—সমাজের প্রায় সব স্তরেই এর বিস্তার ঘটেছে।
কেন মানুষ দিন দিন এতটা হিংস্র হয়ে উঠছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক হতাশা, মানসিক চাপ, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং কর্মসংস্থান সংকট এর অন্যতম কারণ। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ মানুষকে অপরাধ করতে সাহসী করে তুলছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য মানুষের সহনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিন এ প্রসঙ্গে বলেন, মানুষের মনে দীর্ঘদিন ধরে জমা হওয়া ক্ষোভ ও বঞ্চনা এখন সহিংসতার মাধ্যমে বেরিয়ে আসছে। তার মতে, একজন শিক্ষিত তরুণ যখন কর্মসংস্থান পায় না, তখন তার মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়, তা সামাজিক উস্কানি পেলে সহিংস রূপ নেয়। এছাড়া অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবণতা সমাজে এক ধরনের ভুল বার্তা দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়াও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ মনে করেন, দেশে সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিশুদের এখন আর ধৈর্য বা শৃঙ্খলা শেখানো হয় না, ফলে তারা সামান্য আঘাতেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। বিচারব্যবস্থার ধীরগতির কারণে মানুষ অপরাধ করতে ভয় পায় না। আগে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষ এগিয়ে আসত, কিন্তু এখন মানুষ হয় চুপ থাকে, নয়তো সেই দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে। এই নির্লিপ্ততা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে।
অন্যদিকে, নারী ও জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক বিষয়টিকে মানবিক সংকটের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে সহনশীলতা কমে যাচ্ছে। পারিবারিক শিক্ষার বন্ধন ঢিলেঢালা হয়ে পড়েছে। এখন মানুষ বাস্তবের সম্পর্কের চেয়ে ডিজিটাল জগতের ওপর বেশি নির্ভরশীল, ফলে মানুষের প্রতি মানুষের মায়া বা গভীরতা কমছে।
তার মতে, কেবল আইন দিয়ে এই পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়। এর জন্য পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বড় ভূমিকা নিতে হবে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, সহিংসতা কেবল একটি আইনি সমস্যা নয়, এটি সমাজের গভীর নৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ। যখন মানুষ নিজেকে অনিরাপদ মনে করে এবং ন্যায়বিচারের আশা হারিয়ে ফেলে, তখন সমাজিক বন্ধন আলগা হয়ে যায়। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের সামাজিক কাঠামো নতুন করে গড়তে হবে। যেখানে শিক্ষা হবে মানবিক, পরিবার হবে সহনশীলতার আধার এবং রাষ্ট্র হবে ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল। সম্মিলিত সচেতনতাই এই ভয়াবহ সহিংসতার পথ রুখে দিতে পারে।


