নতুন মার্কিন নিরাপত্তা কৌশল: চাপের মুখে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক

নতুন মার্কিন নিরাপত্তা কৌশল: চাপের মুখে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক
Advertisement
Advertisement

মাছুদ চৌধুরী: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি যে জাতীয় নিরাপত্তা নীতি প্রকাশ করেছে, সেখানে চীনকে তারা এখন খোলাখুলিভাবে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে। এর ফলে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কাজের ধরনে বড় পরিবর্তন আসছে।

বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যার উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলো দিন দিন চীনের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন নীতি বাংলাদেশের জন্য সামনের বছরগুলোতে আরো বেশি আন্তর্জাতিক চাপ এবং সাবধানে কূটনীতি চালানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চীন কেন বাংলাদেশের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ

চীন অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সামরিক—সব দিক থেকেই বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু। গত কয়েক বছরে চীন বাংলাদেশে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। তারা বড় বড় বন্দর, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্প এলাকা এবং যোগাযোগের রাস্তা তৈরি করতে টাকা দিয়েছে। এগুলোই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নের মূল ভিত্তি।

২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর ঢাকা সফর এই সম্পর্কে একটি খুব বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। ৩০ বছরের মধ্যে এটি ছিল কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের প্রথম সফর। এই সময় দুই দেশ তাদের সম্পর্ককে “কৌশলগত অংশীদারিত্ব”-এর স্তরে নিয়ে যায়, যা বাংলাদেশের অন্য কোনো দেশের সাথে নেই। এই অংশীদারিত্বের কারণে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বিশ্বাস বেড়েছে, বিনিয়োগ বেড়েছে এবং আঞ্চলিক উন্নয়নে তারা একসঙ্গে কাজ করছে।

সামরিক সরঞ্জামের জন্যেও বাংলাদেশ এখন মূলত চীনের ওপর নির্ভরশীল। সাবমেরিন, যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র—বাংলাদেশের আধুনিক সামরিক সরঞ্জামের বড় একটি অংশ এখন চীন থেকে কেনা। এটি একদিকে যেমন বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাড়ায়, অন্যদিকে চীনকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং সস্তা সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যখন তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে, তখন এই সামরিক নির্ভরতা বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল কৌশলগত পরিস্থিতি তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতিতে কী বলা আছে

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র চলতি বছর তৈরি তার জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে স্পষ্ট করে বলছে: চীন হলো যুক্তরাষ্ট্রের  এক নম্বর প্রতিদ্বন্দ্বী। যুক্তরাষ্ট্র এখন সন্দেহের চোখে দেখছে যে, চীন বিদেশে অর্থনৈতিক কাজ এবং অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ করে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদগুলো দখল করতে চাইছে—বিশেষ করে বন্দর, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক এবং জ্বালানি খাত।

বাংলাদেশের অনেক বড় উন্নয়ন প্রকল্পেই চীনা অর্থ বা ঠিকাদার জড়িত। তাই যুক্তরাষ্ট্রের এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণে পশ্চিমের দেশগুলো এখন বাংলাদেশের প্রকল্পগুলোর ওপর বেশি নজরদারি করবে। এর ফলে, ঢাকাকে হয়তো ওয়াশিংটনের চাপের মুখে চীনা-সমর্থিত প্রকল্পগুলো, বিশেষ করে যেগুলো সামরিক কাজেও ব্যবহার হতে পারে, সেগুলোর কারণ ব্যাখ্যা করতে বা সিদ্ধান্ত বদলাতে হতে পারে।

ভারতের গুরুত্ব বৃদ্ধি

যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে এখন তাদের প্রধান রণক্ষেত্র ভাবছে। তারা তাদের আঞ্চলিক কৌশলের কেন্দ্রে রেখেছে ভারতকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি এবং সরবরাহ চেইনে যে অংশীদারিত্ব বাড়ছে, তা এখন চীনা প্রভাব মোকাবিলা করার মূল হাতিয়ার হিসেবে তৈরি হচ্ছে।

এটি বাংলাদেশের কূটনীতিকে কঠিন করে তুলছে। কারণ, বাংলাদেশ সব সময়ই উন্নয়নের প্রধান অংশীদার চীন এবং ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে চেয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের ঘনিষ্ঠতা বাড়লে বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা বা বড় অবকাঠামো প্রকল্পের মতো বিষয়গুলিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কিছুটা কমতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য সুযোগও আছে

তবে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নীতি শুধু সমস্যাই আনেনি, সুযোগও তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে যেন বিশ্বের উৎপাদন কারখানাগুলো চীন থেকে সরে অন্য দেশে যায়। বাংলাদেশ যেহেতু এখন থেকেই পোশাক শিল্পে বিশ্বজুড়ে বড় খেলোয়াড়, তাই তারা নতুন করে বস্ত্র, ওষুধ, ইলেকট্রনিক্স এবং হালকা প্রকৌশলের মতো খাতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে, বাংলাদেশকে অবশ্যই পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সরকারি নীতিমালায় যে দুর্বলতাগুলো আছে, সেগুলোর উন্নতি করতে হবে।

সব মিলিয়ে, আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশকে খুব সাবধানে কূটনীতি চালাতে হবে এবং তার অর্থনৈতিক উন্নতির দিকে নজর দিতে হবে, যাতে সে কোনো শক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে না গিয়ে নিজের স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad