কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দিগন্তজোড়া মাঠ এখন হলুদের সমারোহে সেজেছে। প্রকৃতির আপন খেয়ালে সরিষা ফুলের এই হলুদ গালিচা যেন জানান দিচ্ছে শীতের রূপ। মৌমাছির গুনগুনে মুখর সেই মাঠগুলোতে এখন সারি সারি কাঠের বাক্স পেতে মধুর স্বপ্ন বুনছেন মৌচাষিরা। কিন্তু প্রকৃতির এই নয়নাভিরাম দৃশ্যের আড়ালে এখন চাষিদের মনে বাসা বেঁধেছে একরাশ দুশ্চিন্তা আর দীর্ঘশ্বাস।
দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত স্থানীয় ‘সলিট হানি’র স্বত্বাধিকারী ফরহাদ হোসেন। যাদুরচর ইউনিয়নের কাশিয়াবাড়ি এলাকায় ১২০টি বাক্স বসিয়েছিলেন তিনি। অভিজ্ঞ এই চাষির কণ্ঠে এবার ঝরল চরম হতাশার সুর। তিনি আক্ষেপ করে জানালেন, তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশার প্রকোপে তার বাক্সের মৌমাছিরা ব্যাপক হারে মারা যাচ্ছে। ফলে প্রত্যাশিত মধু তো মিলছেই না, উল্টো শ্রমিকের বেতন আর আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে লোকসানের বোঝা ভারী হচ্ছে।
একই সংকটে পড়েছেন সাতক্ষীরা থেকে রৌমারীতে মধু সংগ্রহ করতে আসা সুমন মিয়া। তুরা রোডের পাশে শাহজাহানের বাড়ির কাছে দীর্ঘ এক মাস ধরে চেষ্টা চালিয়েও আবহাওয়ার প্রতিকূলতায় কাঙ্ক্ষিত মধু সংগ্রহ করতে পারেননি তিনি। তবে নিরাশার মাঝেও আশার প্রদীপ জ্বেলে সুমন ভাবছেন, হয়তো অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই সংকট কেটে যাবে।
অবশ্য এই প্রতিকূলতার মধ্যেও কেউ কেউ লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছেন। বন্দবেড় ইউনিয়নের রয়েল আহমেদ তার ৮০টি বক্স থেকে এরই মধ্যে দুই মণ মধু সংগ্রহ করেছেন।
সাতক্ষীরা থেকে আসা রাজু মিয়াও ১২০টি বক্স বসিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানালেন, আবহাওয়া ঠিক থাকলে প্রতি সপ্তাহে মধু আহরণ করা সম্ভব। বাজারে এই মধুর চাহিদা বেশ ভালো; খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়। যদিও প্রতি মাসে একজন শ্রমিকের জন্য তাকে গুনতে হচ্ছে ১০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে কুমিল্লা থেকে আসা সাকিবও ২৮টি বক্স নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন আগামী দিনগুলোতে উৎপাদন বাড়ার।
মৌচাষিদের দাবি, সরিষার খেত থেকে এই আধুনিক পদ্ধতিতে সংগৃহীত মধু শতভাগ প্রাকৃতিক এবং রাসায়নিকমুক্ত। অল্প পুঁজিতে এটি একটি লাভজনক ব্যবসা। তবে তাদের একমাত্র শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈরী আবহাওয়া। কুয়াশা বাড়লে মৌমাছিরা বাক্স থেকে বের হতে পারে না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে মধু উৎপাদনের ওপর।
রৌমারী উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছে। আর উপজেলার ১৬টি ভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে ২ হাজার ৬০টি মৌ-বক্স।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাইয়ুম চৌধুরী জানান, মৌমাছি শুধু মধুই দিচ্ছে না, বরং সরিষার পরাগায়ণে বড় ভূমিকা রাখছে। এতে সরিষার ফলন ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মধু চাষের এই বিস্তার যেমন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করছে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতিতেও রাখছে ইতিবাচক প্রভাব।


