পোশাকশ্রমিকদের বকেয়া ও মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন সহিংস রূপ নেওয়ায় সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন শ্রমিকনেতারা। জবাবে আন্দোলন শান্ত রাখার অনুরোধ জানিয়েছে সরকার।
প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ হলেও শ্রমিকদের বেতন ঠিক করতে গঠিত ‘সর্বনিম্ন মজুরি বোর্ড’ গত তিন দিনে কোনো বৈঠক করেনি। প্রথম বৈঠক কবে হবে, তাও অনিশ্চিত। তবে বোর্ডের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, গতবার মজুরি চূড়ান্ত করার সময় বোর্ড গঠনের দেড় মাস পর প্রথম বৈঠক হয়েছিল।
এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবারে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
বৈঠকে শ্রমিক নেতারা জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই নতুন সর্বনিম্ন মজুরি ঘোষণা করতে হবে যাতে জানুয়ারি থেকেই শ্রমিকরা নতুন স্কেলে বেতন পান। একই সঙ্গে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে তারা সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলতে চান। কিন্তু স্থানীয় নেতাদের নামে পুলিশের মামলার কারণে অনেক নেতা এলাকা ছাড়া, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
জবাবে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ রাখার তাগিদ দেন শিমুল বিশ্বাস। কোনো তৃতীয় পক্ষ যেন এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সেদিকে নজর রাখার অনুরোধ জানান তিনি।
বৈঠকে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের (আইবিসি) সভাপতি আবুল কালাম আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন স্বপনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
আনোয়ার হোসেন ও বাবুল আক্তার মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
শিমুর বিশ্বাসের সঙ্গে বৈঠকের আলোচনা প্রসঙ্গে আইবিসি সভাপতি আবুল কালাম আজাদ টাইমসকে বলেন, ‘আমরা চেয়েছি ডিসেম্বরের মধ্যে বোর্ডের সব কাজ শেষ হোক। শ্রমিকদের কাছে যেতে হলে পুলিশের গণগ্রেপ্তার বন্ধ করতে হবে এবং কিছুটা নমনীয় আচরণ করতে হবে।’
পোশাক খাতে সবশেষ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আগে পাঁচ বছর পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণের নিয়ম থাকলেও আইন সংশোধন করে তা তিন বছর করা হয়েছে।
সেই অনুযায়ী চলতি বছরের শেষেই শ্রমিকদের নতুন মজুরি পাওয়ার কথা। এ দাবিতে অক্টোবর থেকে উত্তরায় সড়ক অবরোধ শুরু হলেও গত চার দিনে তা মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, হেমায়েতপুর, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে।
সরকারের দাবি, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এ অসন্তোষে ইন্ধন ও অর্থ জোগাচ্ছেন। কিছু কারখানা মালিকও পেছনে থেকে উসকানি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়।
অন্যদিকে, গাজীপুরের গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সম্পাদক স্মৃতি আক্তার টাইমসকে জানান, সহিংসতায় ইন্ধনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘১৯৯৪ সাল থেকে এই খাতে আছি। আগে আন্দোলন হলে বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করা হতো, এখন করা হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। অথচ আমি বা আমার পরিবার কখনোই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করিনি।’
আন্দোলন চতুর্থ দিনে পড়ার দিনই অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে নেতাদের গ্রেপ্তার ও শ্রমিকদের রাজনৈতিক অস্ত্র বানানোর অভিযোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
শিমুল বিশ্বাস বলেন, ‘পোশাক খাত ও দেশ দুটিই আমাদের। আন্দোলন যেন শান্তিপূর্ণ থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।’
মজুরি বোর্ডের বৈঠক আটকে কেন?
রপ্তানি আয়ের মূল উৎস পোশাক খাত অচল হয়ে পড়লেও তিন দিনে কোনো বৈঠক করেনি মজুরি বোর্ড। সরকারের দাবি, শিগগিরই কাজ শুরু হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বোর্ডের স্বতন্ত্র সদস্য মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘বৈঠক কেন হচ্ছে না তা আমার জানা নেই। ডাকলে অবশ্যই যাব।’
মালিকদের প্রতিনিধি আসিফ আইয়ুব বলেন, ‘চলমান আন্দোলন শিল্প ও দেশ—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর। আমরা বৈঠকের অপেক্ষায় আছি।’
বোর্ডের বিলম্ব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আইবিসির সালাউদ্দিন স্বপন বলেন, ‘জরুরি পরিস্থিতিতে প্রথম দিনেই বৈঠক হওয়া উচিত ছিল।’
তবে বোর্ডের চেয়ারম্যান শেখ আশফাকুর রহমান আশ্বাস দিয়ে জানান, ২০২৩ সালে ৪৫ দিন পর বৈঠক হলেও এবার খুব দ্রুতই সদস্যরা বৈঠকে বসবেন।


