প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, শুধু ডিসেম্বর নয়, শেখ হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করছে সরকার।
তিনি বলেন, যেকোনো মূল্যে এ ধরনের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করা হবে।
মঙ্গলবার সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা প্রসঙ্গে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মজুরি সাধারণত পাঁচ বছর পরপর পুনর্নির্ধারণ করা হতো। সর্বশেষ ২০২৩ সালে মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই হিসাবে ২০২৬ সালে নতুন করে মজুরি বোর্ড গঠনের কথা ছিল না।
অতীতের মজুরি পুনর্নির্ধারণের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৬, ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এবার শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় নির্ধারিত সময়ের আগেই মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার।
জাহেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পোশাকশ্রমিকদের জীবন কঠিন হয়ে উঠছে। সরকার এ বাস্তবতা অস্বীকার করছে না। শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়েই নির্ধারিত সময়ের আগে মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও যেভাবে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনের মধ্যে সহিংসতা ও নাশকতার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, কিছু মানুষের মধ্যে যে ধরনের সহিংস আচরণ দেখা গেছে, তা কোনোভাবেই প্রকৃত পোশাকশ্রমিকদের আচরণ হতে পারে না বলে তিনি মনে করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে উপদেষ্টা বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব ঘটনার সঙ্গে সীমান্তের ওপারের সংশ্লিষ্টতার কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সক্ষমতা না থাকলেও দলটির কাছে থাকা বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন জায়গায় নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথ তৈরি করতে এসব অস্থিরতা সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ বলেন, বিষয়টি শুধু ডিসেম্বরকেন্দ্রিক নয়। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত এ ধরনের চেষ্টা চলতে পারে বলে সরকার মনে করে।
তিনি আরও বলেন, ‘এটা ডিসেম্বর না। এটা পুরো সময়, যতদিন উনি বেঁচে আছেন, উনার এই চেষ্টা চলবে বলে আমরা মনে করি এবং আমরা এটাকে প্রতিহত করব।’
এ প্রসঙ্গে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম দিনে শেখ হাসিনার দেওয়া একটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, ওই সময় নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এই সরকারকে এক দিনও শান্তিতে থাকতে দেবেন না। সেই মানসিকতার প্রতিফলন এখনো থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে বহিরাগত, কিশোর ও তরুণদের অংশগ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, অস্থিরতা মোকাবিলায় সরকার আগের মতো দমন-পীড়নের পথ অনুসরণ করতে চায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইন মেনে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী আনুপাতিক হারে বল প্রয়োগ করতে হবে।
পুলিশের বলপ্রয়োগ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পুলিশ কখনোই হাসিনার আমলের পুলিশের মতো হবে না। নাগরিক হিসেবে তিনি মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বল প্রয়োগের আইনি অধিকার রয়েছে। তবে তা অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে এবং আনুপাতিক হতে হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোথাও কোথাও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বল প্রয়োগের ঘটনা দেখা গেছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, সরকারে থাকা অবস্থায় নয়, নাগরিক হিসেবেও তিনি বিষয়টি বলছেন। সরকার চায়, অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ভয় ও ক্ষয়ক্ষতি যেন যতটা সম্ভব কম হয়।
তিনি আরও বলেন, আন্দোলনে কারা যুক্ত হচ্ছেন এবং কীভাবে এসব ঘটনা ঘটছে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তবে সরকার এমনভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চায়, যাতে জনগণের ওপর এর প্রভাব কম পড়ে।
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন দ্রুত শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করে জাহেদ বলেন, শুরুতে শ্রমিকদের কিছু ন্যায্য দাবি ছিল। সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করায় শ্রমিকদের বিষয়টি বোঝানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শ্রমিকরা আন্দোলন থেকে সরে এলে তাদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অন্য কারও পক্ষে অস্থিরতা সৃষ্টি করা কঠিন হবে।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন।


