ঈদুল আযহাকে সামনে রেখে দেশের সিনেমা হলগুলোয় ২০১৩ সালের ১৬ অক্টোবর মুক্তি পেয়েছিলো পাঁচটি সিনেমা, যার মধ্যে তিনটিই ছিল শাকিব খানের। হল মালিকদের ধারণা ছিল এর মধ্যে মালেক আফসারী পরিচালিত ‘ফুল অ্যান্ড ফাইনাল’ ব্যবসা করবে সবচেয়ে বেশি। সিনেমাটির জন্য তাই বেশি হলও বরাদ্দ দিয়েছিল ব্যবসায়ীরা। তেমন আশা না থাকায় তুলনামূলক কম হলে মুক্তি পায় সাফি উদ্দিন সাফি পরিচালিত ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী’।
চিত্র বদলে যায় সিনেমা মুক্তির পর। অল্পসংখ্যক হল নিয়ে যাত্রা শুরু করা ছবিটিই শততম দিনে গিয়ে দখল করে ১৩০টি হল। হয়ে উঠে সে বছরের সবচেয়ে ব্যবসা সফল সিনেমা। সে সিনেমাটি নিয়ে আমাদের এবারের টাইমস ব্লকবাস্টার।
প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও শিক্ষক মতিন রহমান সিনেমাটির রিভিউতে প্রশংসা করেছেন শিল্পীদের অভিনয়ের। একটি জাতীয় দৈনিকে সে বছর তিনি লিখেছিলেন, ‘দৃশ্য অভিনয়ে সব চরিত্রই স্বাভাবিক আচরণশিষ্ট। কৌতুকরস সৃষ্টিতে সাজু খাদেম ভাঁড়মুক্ত। দর্শকদের বিবেচনায় জয়া আহসান এবং আরিফিন শুভ সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে ছিলেন। ‘কানে লাগে’ সংলাপ উচ্চারণ এবং ট্যাক্সি ক্যাবের ওপর দাঁড়িয়ে একক নাট্য অভিব্যক্তি প্রকাশে আরিফিন শুভ প্রশংসনীয়।’ গানের প্রশংসা করে তিনি লিখেছেন, ‘গীত-শব্দ রচনায় কবির বকুল নিজের শব্দশক্তির প্রমাণ রেখেছেন। চন্দন সিনহার কণ্ঠে “তুমি আছো বলে তারা নিভে জ্বলে” গানটি প্রাণপ্রাচুর্যে গীত হয়েছে। প্রতিটি গানের দৃশ্য নির্বাচন ও কোরিওগ্রাফি থিমেটিক সৌন্দর্যের ডকুমেন্টেশন।’
‘আবহ সংগীত রচনায় আরও মনোযোগের প্রয়োজন ছিল। জয়া আহসানকে নিয়ে দুই নায়কের থিম সংগীত আর পার্থক্য ভিন্নতা দাবি করেছিল,’ বলেও মন্তব্য করেন মতিন রহমান।
হালকা সমালোচনার পাশাপাশি বেশ কিছু কড়া সমালোচনাও তুলে আনেন মতিন রহমান। এর মধ্যে রয়েছে— হাতিরঝিলের সেতুকে মালয়েশিয়া বলার কথা। এছাড়া ডাক্তারি পেশায় কত টাকা উপার্জনের পর তিনি প্রাসাদসম বাড়ির মালিক হলেন, আরিফিন শুভর গুলিতে দিতি ও সুব্রতর মারা যাওয়া, আবার অপারেশনের পর অলৌকিকভাবে দিতির বেঁচে উঠা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি।
এসব প্রশ্ন শুধু মতিন রহমানের ছিলো না, ছিলো অনেক দর্শকেরও। তারপরও সিনেমাটি কেন ব্যবসাসফল হয়েছিলো? চলচ্চিত্র ব্যবসা বিশেষজ্ঞদের মতে এর পিছনে বেশ কিছু ফ্যাক্টর কাজ করেছে।
তাদের মতে, এটি শাকিব খান ও জয়া আহসান জুটির প্রথম সিনেমা। ফলে দর্শকদের মধ্যে দুজনের রসায়ন দেখার আগ্রহ ছিল প্রবল। আরিফিন শুভ ও শাকিবের একসঙ্গে প্রথম ও একমাত্র সিনেমাও এটি। আরিফিন শুভ তখন নাটকের প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার ছেড়ে চলচ্চিত্রে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছেন। ফলে তার একটা আলাদা ভক্তশ্রেণী তৈরি হয়েছে। শাকিব-জয়ার ভক্তদের পাশাপাশি তারাও সিনেমা হলের টিকেটের লাইনে ভিড় করেছে।
পাশাপাশি সিনেমাটি ছিল মাল্টিকাস্টিং— এতে নায়ক রাজ রাজ্জাক, ববিতা, সোহেল রানা, আনোয়ারা, দিতির মতো বড় তারকা শিল্পীরা অভিনয় করেছেন। যা কিনা ঢালিউডের খুব কম সিনেমায় দেখা যায়।
সিনেমাটির সফলতার পিছনে আরেকটি বিষয়কে এগিয়ে রাখা হয়—এর গান। কবির বকুলের লেখা ও শওকত আলী ইমনের সুরে করা গানগুলো দর্শক-শ্রোতারা পছন্দ করেছিল বেশ। এর মধ্যে ‘ও প্রিয় আমি তোমার হতে চাই’ এবং ‘আমি নিঃস্ব হয়ে যাবো’ গান দুটি সকল শ্রেণির দর্শকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে সেসময়।
রুম্মান রশীদ খানের কাহিনি ও চিত্রনাট্যে সিনেমাটি ২০১৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ৪টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার জিতে। এছাড়া জিতেছিল ৩টি মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার। ফ্রেন্ডস মুভিজ প্রযোজিত সিনেমাটির ব্যবসায়িক সফলতা দেখে এর সিক্যুয়েল ‘পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেম কাহিনী ২’ নির্মিত হয়েছিল। সেটি মুক্তি পেয়েছিলো ২০১৬ সালে।


