সদরঘাটে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, চাহিদা বেশি কেবিনে

সদরঘাটে যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড়, চাহিদা বেশি কেবিনে
সদরঘাট | ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

ঈদুল ফিতরের ছুটি শুরু হতে না হতেই রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে। দীর্ঘ সময় পর টার্মিনাল ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা রূপ, হাজারো মানুষের হাঁকডাক আর হুড়োহুড়ি। তবে এই উৎসবের আমেজে বিষাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবিনের টিকিট। সাধারণ যাত্রীদের কাছে একটি কেবিন পাওয়া এখন যেন অনেকটা সোনার হরিণ পাওয়ার মতো দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।

মঙ্গলবার সদরঘাটে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পন্টুনে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। লঞ্চের ডেকগুলো যাত্রীতে ঠাসা, কিন্তু হাহাকার শুধু কেবিন নিয়ে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে যারা বাড়ি ফিরছেন, তাদের ভোগান্তি চরমে।

এদিন গাজীপুর থেকে বিকালে পরবারসহ সদরঘাটে আসেন বদরুদ্দীন মিয়া। পরিবারসহ তার গন্তব্য বরিশাল। বিকাল ৫টার সময় এসে অন্তত ৮টি লঞ্চ ঘুরে তিনি কোনো কেবিনের টিকিট পায়নি। হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিকাল ৫টায় ঘাটে এসেছি। বরিশালগামী ৮টি লঞ্চ ঘুরে একটি কেবিনও পায়নি। এমন কেবিন সংকট হবে বুঝতে পারিনি।

শুধু বদরুদ্দীন নয়, অগ্রিম বুকিং অনেক আগেই শেষ হয়ে যাওয়ায় ঘাটে এসে হন্যে হয়ে কেবিন খুঁজছেন শত শত যাত্রী। সুন্দরবন ১২ লঞ্চের কেরানি শিপন বলেন, ‘ডেক এখন আর খালি যাচ্ছে না। লঞ্চ ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই যাত্রীরা জায়গা দখল করে নিচ্ছে। এখন সবাই কেবিনের জন্য অনুরোধ করছেন, কিন্তু আমাদের হাত-পা বাঁধা। এমনকি মানুষ এখন কেবিন না পেয়ে ছাদে ওঠার জন্য জেদ ধরছে, যা সামলাতে আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

ঘাটের লঞ্চ গুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে চাঁদপুর, ভোলা, বরিশাল ও পটুয়াখালী রুটের লঞ্চগুলোতে। মানিক-৫ লঞ্চের স্টাফ সাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘কেবিনের চাহিদা অনেক। আমাদের কোনো সিংগেল বা ডাবল কেবিন ফাঁকা নেই। সব বুকড।’

ঘাটে কেবিন না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক যাত্রী। ছোট সন্তান নিয়ে পন্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা রাশেদা জামান হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘বাচ্চা নিয়ে এই ভিড়ে ডেকে যাওয়া অসম্ভব। আমি কেবিনের জন্য ডাবল ভাড়া দিতেও রাজি ছিলাম, কিন্তু কোনো লঞ্চেই টিকিট নেই। কেবিন যেন এখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য সোনার হরিণ হয়ে গেছে। প্রশাসনের দেখা উচিত পর্দার আড়ালে কোনো কালোবাজারি হচ্ছে কি না।’

আরও পড়ুন

একই সুরে কথা বলেন সরকারি চাকুরিজীবী বোরহান উদ্দীন। তিনি জানান, গত কয়েকদিন ধরে পরিচিত সব জায়গায় যোগাযোগ করেও একটি কেবিনের ব্যবস্থা করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘এখন বাধ্য হয়ে চড়া দামে কালোবাজারে টিকিট খোঁজার চেষ্টা করছি।’ তবে অতিরিক্ত ভাড়ার লিখিত অভিযোগ মেলেনি। টিকিট না পাওয়ার আড়ালে সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে বলে যাত্রীদের অভিযোগ আছে।

পল্টন থেকে সদরঘাটের প্রবেশপথ পর্যন্ত তীব্র যানজট নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন সাগর হোসেন নামে এক যাত্রী। তিনি বলেন, ‘পল্টন থেকে সদরঘাট আসতেই সব শক্তি শেষ হয়ে যায়। এই ভোগান্তি দূর না করলে মানুষ লঞ্চ বিমুখ হবে।’

এদিকে, সদরঘাটে যাত্রী চাপ বাড়াতে অন্যান্য দিনের তুলনায় এদিন বিভিন্ন রুটে লঞ্চ বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জানা যায় সদরঘাট কন্ট্রোলরুম সূত্রে। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের কন্ট্রোল রুমের দ্বায়িত্বে থাকা সুমন রানা বলেন, সদরঘাট থেকে বিভিন্ন রুটের অন্য শতাধিক লঞ্চ প্রস্তুত রয়েছে। এদিন রাত ৮টা পর্যন্ত ৬৫টি লঞ্চ সদরঘাট থেকে ছেড়ে গেছে। যাত্রীদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে লঞ্চ বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, আজ অন্তত ১০০টি লঞ্চ সদরঘাট ছেড়ে যাবে।

এদিকে, সদরঘাটে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও বাড়তি ভাড়া যেন আদায় না হয় সেজন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থার।

তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চাহিদার তুলনায় কেবিনের সংখ্যা সীমিত হওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একটি লঞ্চে ডেকের তুলনায় কেবিনের সংখ্যা খুবই কম থাকে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে যারা ভ্রমণ করেন, তাদের সবার প্রথম পছন্দ কেবিন।

‘আমরা শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে অগ্রিম বুকিং নিয়েছি। কিন্তু চাহিদা এতই বেশি যে অনেক নিয়মিত যাত্রীকেও আমরা কেবিন দিতে পারছি না। তবে আমরা স্পষ্ট করে বলছি, কোনো লঞ্চ মালিক বা স্টাফ যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় না করে সেদিকে কঠোর নজরদারি রয়েছে।’

যাত্রীদের নিরাপত্তা ও বিশৃঙ্খলা রোধে তৎপর রয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মো. মুবারক হোসেন বলেন, ‘আমরা যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করছি। কেবিন নিয়ে যেন কোনো ধরনের কালোবাজারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয় সেদিকে আমাদের কঠোর নজরদারি রয়েছে। অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে না ওঠার জন্য আমরা বারবার সতর্ক করছি।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad