সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে থাকলেও সংসদে উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম- নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ)। জুলাই অভ্যুত্থান পরিবর্তী সময়ে সংস্কার প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক ব্যর্থতা ও গুরুতর ত্রুটিও চিহ্নিত করেছে প্ল্যাটফর্মটি।
সোমবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠের সময় এসব কথা বলেন এনপিএ-এর মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী।
তিনি দাবি করেন, বর্তমান মেয়াদে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রক্রিয়া “অস্বচ্ছ, অগণতান্ত্রিক এবং ছোট দলগুলোর প্রতি বৈষম্যমূলক”।
গণভোটের ব্যালটে আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষের বিধান থাকলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো তাদের ১০০ জন প্রার্থীর কোনো তালিকা প্রকাশ করেনি।
প্ল্যাটফর্মটির মতে, প্রার্থী তালিকা প্রকাশ না করেই প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ নির্বাচন হলে জনগণ কাদের উচ্চকক্ষে পাঠাচ্ছে তা না জেনেই ভোট দিতে বাধ্য হবে, যা গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার পরিপন্থী।
১২ ফেব্রুয়ারি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর জনগণ ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। তবে সংস্কার প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিকতা ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিতে অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতা কিংবা অনাগ্রহ পানির মতো পরিষ্কার।’
এনপিএ-এর অভিযোগ, সরকার নিরপেক্ষভাবে গণভোটের বিষয়াদি জনগণের সামনে তুলে ধরার পরিবর্তে কেবল ‘হ্যাঁ ভোটের পক্ষে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে গালভরা প্রচারের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াকে জনবিচ্ছিন্ন করে তুলেছে’। হ্যাঁ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রকাশ্য প্রচারণা এবং প্রধান উপদেষ্টার সক্রিয় অবস্থান গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করছে বলে মনে করে প্ল্যাটফর্মটি।
সংবাদ সম্মেলনে এনপিএ গণভোট প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু মৌলিক সমস্যাও চিহ্নিত করেছে। প্রথমত, প্যাকেজ ভোটিং পদ্ধতিতে একাধিক সাংবিধানিক বিষয় একটি মাত্র হ্যাঁ/না প্রশ্নে উপস্থাপন করায় জনগণ আলাদা বিষয়ে স্বাধীন মতামত দিতে পারছে না।
তাদের ভাষায়, ‘এ ধরনের প্যাকেজ পদ্ধতি ভোটারদের “হয় সব, নয় কিছুই না” অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে।’
দ্বিতীয়ত, ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের নোট অব ডিসেন্টসহ যে রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে উঠেছিল তা যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়নি বলে অভিযোগ করেছে এনপিএ।
প্ল্যাটফর্মটি সরকারের একপক্ষীয় প্রচারণারও সমালোচনা করে বলে, ‘সরকার একদিকে গণভোট আয়োজনকারী ও নিয়ন্ত্রক, অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট ভোটের পক্ষে প্রচারকারী ভূমিকা নিয়ে স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করছে।’
এ ছাড়া শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন, শ্রমিকের মজুরি ও অধিকার, নারী অধিকার নিশ্চিতসহ জরুরি সংস্কারগুলো উপেক্ষিত হয়েছে বলেও মনে করে এনপিএ।
এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্ল্যাটফর্মটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমরা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের পক্ষে। আমরা স্থবিরতার পক্ষে নই।’
প্রস্তাবিত সংস্কারে প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকাঠামো ভাঙা, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশনের মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, দুর্নীতি দমন কমিশন ও নির্বাচন কমিশনকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালসহ বেশ কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে।
এনপিএ স্পষ্ট করে, ‘না’ জয়যুক্ত হলে সংস্কার প্রশ্নটিকেই ক্ষমতাসীনরা কার্যত বাতিল করে দেবে। এই আশঙ্কাতেই তারা শেষ বিচারে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
তবে উচ্চকক্ষের ক্ষেত্রে পরবর্তী নির্বাচন থেকে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও পৃথক ব্যালটের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উচ্চকক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছে প্ল্যাটফর্মটি।


