সংবাদমাধ্যমে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নতুন নীতিমালা প্রকাশ

সংবাদমাধ্যমে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নতুন নীতিমালা প্রকাশ
Advertisement
Advertisement

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন বাংলাদেশ।

বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে নীতিমালাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। এফসিডিও-এর সহায়তায় বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন পরিচালিত ‘স্ট্রেনথেনিং উইমেন জার্নালিস্টস নেটওয়ার্ক টু ট্যাকল সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় এটি প্রণয়ন করা হয়।

অনুষ্ঠানে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সিনিয়র সাংবাদিকরা বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও প্রতিকারে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। কেবল নীতিমালা নয়, কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন দৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা ও অঙ্গীকার।

সংবাদপত্র মালিকদের সংগঠন নোয়াব সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিন প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘যৌন নিপীড়ন সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। প্রোটোকল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; প্রতিটি নিউজরুমে এ নিয়ে আলোচনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। মালিক-সম্পাদকসহ সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’

তিনি জেলা পর্যায়েও উদ্যোগ বিস্তারের আহ্বান জানান এবং উল্লেখ করেন, পুরুষ সাংবাদিকরাও হয়রানির শিকার হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘প্রোটোকলটি পুরো সিস্টেমের জন্য প্রযোজ্য। জেন্ডার-ফ্রেন্ডলি মিডিয়া হাউসকে স্বীকৃতি দিলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’

চ্যানেল আইয়ের প্রধান বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান রনি বলেন, ‘এটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, তবে এইচআর নীতিতে অন্তর্ভুক্তি জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে নিপীড়ক থেকে যায়, ভুক্তভোগী চাকরি হারান—এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।’

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সংগঠন ওকাব সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠু বলেন, ‘দেশে আইন থাকলেও তা বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। এই ধরনের গাইডলাইন কার্যকর চর্চার মধ্যেই পরিবর্তন আসবে।’

ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কমিউনিকেশনস অ্যানালিস্ট শারারত ইসলাম বলেন, ‘এটি সহজ ও কার্যকর দলিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাস্তবায়ন জরুরি; মূল চ্যালেঞ্জ হলো বাস্তবায়ন। বড় গণমাধ্যমগুলো এগিয়ে এলে অন্যরাও উৎসাহিত হবে।’

বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের হয়ে প্রোটোকল প্রস্তুতকারী সুলাইমান নিলয় বলেন, ‘বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা রয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা কার্যকর। এই নীতিমালা নতুন বাধ্যবাধকতা তৈরি না করে বিদ্যমান দায়িত্ব পালনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।’

বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন বলেন, ‘সংবাদমাধ্যমে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা ১০ শতাংশের কম। নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া এই ভারসাম্য আনা সম্ভব নয়। প্রোটোকল মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনার জন্য দায়বদ্ধতার কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।’

উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের কো-অর্ডিনেটর আঙ্গুর নাহার মন্টি বলেন, ‘লোকলজ্জার কারণে যৌন হয়রানির ঘটনা প্রায়ই আড়ালে থাকে। সহকর্মীরা নিরাপদ বোধ না করলে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এই নীতিমালা নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরির প্রাথমিক ভিত্তি; নারী-পুরুষ সবার জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য।’

বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের সিনিয়র মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অফিসার আরাফাত সিদ্দিক জানান, প্রোটোকলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি, সচেতনতা বৃদ্ধি, শাস্তির বিধান স্পষ্টকরণ এবং কার্যকর সুরক্ষা নেটওয়ার্ক গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে গড়ে ১৫ শতাংশ সংবাদকর্মী কর্মক্ষেত্রে সরাসরি যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মৌখিক হয়রানির শিকার নারী ৫১ শতাংশ ও পুরুষ ৮ শতাংশ; অনলাইন হয়রানিতে নারী ৪৩ শতাংশ ও পুরুষ ১৪ শতাংশ; শারীরিক হয়রানিতে নারী ২১ শতাংশ ও পুরুষ ৪ শতাংশ। এ ছাড়া ৭ জন নারী ও ২ জন পুরুষ ধর্ষণের শিকার হওয়ার কথা জানিয়ে থাকেন।

অনুষ্ঠানে প্রথম আলো অনলাইন ইংরেজি সংস্করণ সম্পাদক আয়েশা কবীর, সিনিয়র সাংবাদিক মনিমা সুলতানা, শাহনাজ বেগম, নাদিরা কিরণ, নাজনীন আখতার, ইন্টারনিউজ কান্ট্রি প্রতিনিধি শামীম আরা শিউলি, বৈশাখি টেলিভিশনের হেড অফ নিউজ জিয়াউল কবীর সুমন এবং বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নাসিমা আক্তার সোমা বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীরা সম্মিলিতভাবে সংবাদমাধ্যমে প্রোটোকলটি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad