মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে সুস্পষ্ট নীতিগত রোডম্যাপ ছাড়াই একাধিক ‘যদি-তবে’র ওপর নির্ভর করে পরিস্থিতি মোকাবিলার ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত ২ বিলিয়ন থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসতে পারে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে সম্ভাব্য ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড় পাওয়া গেলে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জাতীয় দৈনিকের বাণিজ্য সম্পাদকদের সঙ্গে এক বৈঠকে এই মূল্যায়ন তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
সভায় গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ও ডেপুটি গভর্নররা বৈদেশিক খাতের ওপর চাপ কমাতে সম্ভাব্য বৈদেশিক প্রবাহের ওপর আস্থা প্রকাশ করেন। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই কৌশলটি একটি সুসংগঠিত নীতিগত প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বেশি নির্ভর করছে আশাবাদী পূর্বাভাসের ওপর।
ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহম্মাদ বলেন, মৌসুমি কারণেও কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। বর্ষাকালে সার আমদানি কমবে এবং রমজান-পরবর্তী সময়ে আমদানি চাহিদা হ্রাস পেয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আইএমএফ থেকে যদি দেড় বিলিয়ন ডলার পাই, এবং গত বছরের তুলনায় রেমিট্যান্স ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বাড়ে, তাহলে আমরা তুলনামূলকভাবে একটি নিরাপদ অবস্থায় যেতে পারবো। বর্তমান পরিস্থিতি যতটা উদ্বেগজনক মনে হচ্ছে, বাস্তবে তা এতটা নাও হতে পারে।’ তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই পূর্বাভাসের প্রতিটি উপাদানই শর্তসাপেক্ষ।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে প্রবাসী শ্রমিকদের আয় কমে যেতে পারে, ফলে প্রত্যাশিত হারে রেমিট্যান্স বাড়বে না। একই সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে মৌসুমি সুবিধা দ্রুতই চাপের মধ্যে পড়ে যেতে পারে।
মাঠপর্যায়ের সূচকগুলো ইতোমধ্যেই চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত জানুয়ারিতে আমদানি প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ। কয়েক মাস ধরেই আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। সামনে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (আকু)-এর বিল হিসেবে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এরই মধ্যে গত এক মাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি কমেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যেই অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে।
আইএমএফের সম্ভাব্য অর্থপ্রাপ্তি নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং মূল সিদ্ধান্ত এপ্রিলের বৈঠকে নেওয়া হতে পারে।
বৈদেশিক খাতের ধাক্কা সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, চলতি অর্থবছরে বাজার থেকে কেনা প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার একটি বাফার হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এর অর্থ দাঁড়ায় প্রয়োজনে রিজার্ভ ব্যবহার করতে হবে, যা ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে থাকা রিজার্ভ পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে দেশ আবারও রিজার্ভ সংকটে পড়তে পারে।
তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, গভর্নরের উচিত সরকারের সঙ্গে বসে একটি সমন্বিত নীতি প্রণয়ন করা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমানে ডলার বাজারে নেট ওপেন পজিশন রয়েছে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার। তবে অনিশ্চয়তার কারণে তারা সক্রিয়ভাবে ডলার কিনছে না, যা একটি সতর্ক পর্যবেক্ষণভিত্তিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিও স্বীকার করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কর্মকর্তারা বলেছেন, তেলের দাম বাড়লে আমদানি-নির্ভর মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়বে। এতে ভর্তুকি ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে। তবে এই চাপ মোকাবিলায় নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা এখনো তুলে ধরা হয়নি।
মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের কাছে কোনো দ্রুত সমাধান নেই।’
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্বিপাক্ষিক সহায়তা বা মূল্যছাড়ের সম্ভাবনার কথা বলা হলেও সেগুলো এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সভায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, তারা একটি ‘ডায়নামিক’ নীতিগত পন্থা অনুসরণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে এটি অনেকটাই ‘ওয়েট-অ্যান্ড-সি’ কৌশলের কাছাকাছি, যেখানে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। বিরূপাক্ষ পাল প্রস্তাব করেন, সংকট মোকাবিলায় সরকারকে একটি জরুরি জ্বালানি ও মুদ্রানীতি কমিশন গঠন করা উচিত।
তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে একটি টেকসই জ্বালানি নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক জ্বালানি নীতি না থাকলে মুদ্রানীতি কার্যকর থাকবে না।’


