এক শ্রেণিকক্ষে থরে থরে সাজানো ধানের বস্তা। আরেক কক্ষে ব্ল্যাকবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন স্কুলেরই এক পিয়ন। এমন চিত্র দেখা গেছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের তৈয়ব খাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
এমন চিত্র সামনে আসার পর স্থানীয়দের মাঝে উঠেছে ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড়। এ ঘটনাকে এলাকার ভেঙে পড়া প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার এক নগ্ন রূপ বলেই মনে করছেন তারা।
সম্প্রতি মাঠপর্যায়ে বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে গিয়ে মাত্র একজন শিক্ষকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। স্কুলের পিয়ন নিয়মিত ক্লাস নেন বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করলেও স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, শিক্ষক সংকটের কারণে তিনি ‘মাঝে মাঝে’ ক্লাস নিয়ে থাকেন।
স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তীব্র শিক্ষক সংকট, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নগণ্য উপস্থিতি আর জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম এখন পুরোপুরি লাটে উঠেছে।
অভিযোগের তির স্কুলের পিয়ন সন্তোষ রায়ের দিকে। তিনি প্রথম শ্রেণির একটি কক্ষকে চার দিন ধরে নিজের ব্যক্তিগত ধানের গুদাম বানিয়ে রেখেছিলেন। পরে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় সমালোচনা শুরু হলে গত ১৩ মে তড়িঘড়ি করে ধানের বস্তাগুলো শ্রেণিকক্ষ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়।
এসব ধানের বস্তা ছিল পিয়ন সন্তোষ রায়ের বাবা বিনয় কৃষ্ণের। স্কুলের সরকারি সম্পত্তি এভাবে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করায় এলাকাবাসীর মনে ক্ষোভ আরও দানা বেঁধেছে।
খবর নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক বছর ধরে কোনো প্রধান শিক্ষক ছাড়াই অভিভাবকহীনভাবে চলছে। কাগজে-কলমে স্কুলের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৮৩ জন। এই শিক্ষার্থীদের জন্য পদ আছে ছয়জন শিক্ষকের, যার মধ্যে তিনটি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। বর্তমানে যে তিনজন শিক্ষক নিযুক্ত আছেন, তারা হলেন শামীম মিয়া, মোসাম্মত রওশনারা খাতুন এবং মনোরঞ্জন রায়।
কিন্তু বাস্তবে পরিদর্শনের দিন স্কুলে কেবল মনোরঞ্জন রায়কেই পাওয়া যায়। বাকি দুজনের বিষয়ে তিনি জানান, রওশনারা খাতুন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন। শামীম মিয়াও অন্য এক ছুটিতে অনুপস্থিত। এমন তীব্র শিক্ষক সংকটের কারণে বাধ্য হয়েই নিজে এবং স্কুলের পিয়নকে সাথে নিয়ে ক্লাস চালাতে হচ্ছে বলে মনোরঞ্জন রায় স্বীকার করেন। পিয়ন সন্তোষ রায়ও নিজেও জানান, তিনি মাঝে মাঝে শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে থাকেন।
তবে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী পূর্ণিমা এবং তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র সোহাগসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, পিয়ন সন্তোষ রায় প্রায় নিয়মিতই তাদের ক্লাস নেন।
স্কুলের এই দুরাবস্থা নিয়ে স্থানীয় দোকানদার নাজমুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকরা ঠিকমতো স্কুলে না আসায় এটি এখন এখানকার নিত্যদিনের ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিয়নই মূলত বাচ্চাদের ভরসা, কারণ শিক্ষকদের দেখা মেলাই ভার। তারা কখনো আসেন, আবার কখনো মন চাইলে আসেন না।
স্কুলের এই দৈন্যদশার পেছনে যাতায়াত ব্যবস্থার চরম অবহেলাকে দায়ী করেছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মনিন্দ্র রঞ্জন রায়। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে যাতায়াতের জন্য ভালো কোনো রাস্তা নেই। বর্ষাকালে কাঁচা পথটি কাদা-পানিতে একদম চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এই দুর্গম রাস্তার কারণেই শিক্ষকরা নিয়মিত স্কুলে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। আর রাস্তার এই বেহাল দশার কারণে দিন দিন স্কুলে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যাও আশঙ্কাজনকহারে কমে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ শরীফ আহম্মদ জানান, তিনি অফিসিয়ালি তদন্ত করে তার মন্তব্য জানাবেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি এখনই কোনো জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই অবহেলিত শিশুদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই নিমজ্জিত থাকবে।


