শ্রম বিধিমালা সংশোধনের সরকারি উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়েছে শেভরন বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন ও টাল্লো বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন শতভাগ বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগে চলা জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মচারীদের শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিল সুবিধা বাতিল বা সীমিত করতে সরকার এ উদ্যোগ নিয়েছে।
শ্রমিক ইউনিয়ন অবিলম্বে এ উদ্যোগ বন্ধ এবং বিদেশি বিনিয়োগে চলা জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও বিদ্যমান আইনসম্মত পাঁচ শতাংশ মুনাফা বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে।
শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিয়ন নেতারা বলেন, জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এ ধরনের সংবেদনশীল ও শ্রমিকস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তড়িঘড়ি করে বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ বৈষম্যমূলক, আইননিভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং শ্রম অধিকার ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
তাদের অভিযোগ, জাতীয় কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার খর্ব করে নির্দিষ্ট কিছু বিদেশি কোম্পানিকে অন্যায় সুবিধা দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে শেভরন বাংলাদেশ এমপ্লয়ি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে বার্ষিক নিট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক মুনাফা অংশগ্রহণ তহবিলে বরাদ্দ দেওয়া বাধ্যতামূলক। দেশি-বিদেশি বহু প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই আইন মেনে তা দিয়ে আসছে।
তিনি আরও বলেন, ‘বৈদেশিক বিনিয়োগে পরিচালিত তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের নামে সরকারের কাছ থেকে অতিরিক্ত এবং বিশেষ আর্থিক সুবিধা ভোগ করছে। এর মধ্যে রয়েছে শতভাগ কস্ট রিকভারি সুবিধা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণ শুল্কমুক্ত আমদানি। এমনকি সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট আয়কর পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার বহন করে। এ অবস্থায় শুধু এসব কোম্পানিকে মুনাফা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলে, তা হবে বৈষম্যমূলক ও বেআইনি।’
তিনি জানান, ২০১৩ সাল থেকে প্রাপ্য মুনাফা না পাওয়ায় শেভরনের শ্রমিকরা ২০২২ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর হাইকোর্ট শ্রমিকদের পক্ষে রায় দিয়ে তিন মাসের মধ্যে শেভরনকে প্রয়োজনীয় তহবিল গঠন করে নিট মুনাফার ৫ শতাংশ পরিশোধের নির্দেশ দেন এবং শ্রম মন্ত্রণালয়কে রায় বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে কোম্পানি আপিল করলে ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত কোনো স্থগিতাদেশ না দিয়ে নিয়মিত শুনানির জন্য বিষয়টি পাঠান। ফলে মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
একইভাবে টাল্লো বাংলাদেশ এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন জানিয়েছে, তাদের করা ২০২১ সালের ৫ শতাংশ মুনাফা সংক্রান্ত মামলাতেও কর্মচারীদের পক্ষে রায় আসে। আপিল বিভাগ ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ওই রায় বহাল রাখে এবং কোম্পানির করা রিভিউ আবেদন এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।।
এ অবস্থায় শ্রম বিধিমালা সংশোধনের যেকোনো উদ্যোগ বিচারাধীন বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল হবে বলে দাবি ইউনিয়নগুলোর।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ২০২২ সালে শ্রম বিধিমালায় সংশোধনের মাধ্যমে ১০০ শতাংশ রপ্তানিমুখী খাতের শ্রমিকদের ৫ শতাংশ মুনাফা থেকে বঞ্চিত করা হয়, যা ব্যাপকভাবে একতরফা ও ন্যায়বিচারবিরোধী সিদ্ধান্ত হিসেবে সমালোচিত হয়। ওই সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ‘এই পরিবর্তন কেন অবৈধ হবে না’ মর্মে রুল জারি করেছে।
ইউনিয়ন নেতারা জানান, চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা এম. সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারা শ্রম বিধিমালা সংশোধনের সাম্প্রতিক উদ্যোগ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ জানান। তবে বৈঠকের পর তাদের কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে, কিছু অস্পষ্ট স্বার্থান্বেষী মহলের চাপের কারণে এই সংশোধনী উদ্যোগ অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এদিকে জাতীয় ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিরা জানান, শ্রমিক পক্ষের আপত্তি সত্ত্বেও ২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পরিষদের ১৩৩তম সভায় বিধিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কনভেনশন-১৪৪-এর পরিপন্থী। একই সভায় বিদেশি বিনিয়োগকৃত জ্বালানি খাতে কর্মরত জাতীয় কর্মচারীদের জন্য ৫ শতাংশের পরিবর্তে এক শতাংশ করার প্রস্তাব শ্রমিক পক্ষ প্রত্যাখ্যান করে।
সংবাদ সম্মেলনে নেতারা বলেন, শ্রমিকদের আইনসম্মত অধিকার খর্ব করার এ ধরনের বৈষম্যমূলক উদ্যোগ অবিলম্বে প্রত্যাহার না করা হলে তারা কঠোর কর্মসূচি ও শক্তিশালী প্রতিবাদ আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন।


