১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর। চাঁদের ধূসর মাটিতে শেষ পদক্ষেপ ফেলেছিলেন ইউজিন সারনান। মহাকাশযান অ্যাপোলো-১৭ এর কমান্ডার হিসেবে বিদায়ের আগে তিনি বলেছিলেন, `আমরা চলে যাচ্ছি… কিন্তু আমরা আবার ফিরব।‘
কিন্তু সেই `ফিরে আসা‘ আজও হয়নি।
এর মধ্যে কেটে গেছে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়। মানুষ মঙ্গলগ্রহে রোবট পাঠিয়েছে, মহাকাশে টেলিস্কোপ বসিয়েছে, কিন্তু চাঁদের মাটিতে আর কোনো মানুষের পায়ের ছাপ পড়েনি।
প্রশ্নটা তাই আজও থেকে যায় কেন মানুষের পা আর চাঁদে পড়েনি?
অবশ্য এখানে কোনো রহস্য বা ষড়যন্ত্র নেই। বরং আছে রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জনগণের আগ্রহ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার এক জটিল ইতিহাসের গল্প। আর সেই গল্প বুঝতে হলে আমাদের ফিরতে হবে আরও অনেক পেছনে, যখন চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল শুধু কল্পনায়।
মানুষের চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন আধুনিক যুগের নয়। বহু শতাব্দী আগে থেকেই মানুষ কল্পনা করেছে পৃথিবীর বাইরে যাত্রার কথা।
খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে গ্রিক লেখক লুসিয়ান অফ সামোসাটা তার ব্যঙ্গাত্মক গল্পে চাঁদে ভ্রমণের কথা লিখেছিলেন। পরে ১৭শ শতকে জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোহানস কেপলার তার বিখ্যাত বই সোমনিয়ামে চাঁদের বৈজ্ঞানিক বর্ণনা দেন।
তবে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে চাঁদে যাওয়ার ধারণাকে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে দেয় ফরাসি লেখক জুল ভার্নের উপন্যাস ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন। ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত উপন্যাসে তিনি কল্পনা করেছিলেন ফ্লোরিডা থেকে বিশাল কামানের সাহায্যে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর গল্প। মজার বিষয় হলো পরবর্তীকালে অনেক রকেট বিজ্ঞানী স্বীকার করেছেন যে শৈশবে এইসব বই তাদের কল্পনাকে নাড়া দিয়েছিল।
এভাবেই কল্পনার পাশাপাশি ধীরে ধীরে জন্ম নিতে থাকে বাস্তব বিজ্ঞানও।
১৯০৩ সালে রাশিয়ান বিজ্ঞানী কনস্টানটিন সিওলকোভস্কি প্রথম রকেট সমীকরণ প্রকাশ করেন, যা আধুনিক রকেট বিজ্ঞানের ভিত্তি। এরপর ১৯২৬ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী রবার্ট এইচ গোডার্ড সফলভাবে পৃথিবীর প্রথম তরল জ্বালানির রকেট উৎক্ষেপণ করেন।
পরে জার্মান প্রকৌশলী ভন ব্রাউন এবং হারম্যান ওবার্থের গবেষণা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভি-২ রকেট তৈরি করতে সাহায্য করে। এই প্রযুক্তিই পরবর্তীতে মহাকাশ অভিযানের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
কিন্তু তবুও তখন পর্যন্ত চাঁদে যাওয়ার ধারণা ছিল অনেক দূরের স্বপ্ন।
স্পেস রেসের সূচনা হয় স্পুটনিকের ধাক্কার মাধ্যমে।
১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর পৃথিবীর আকাশে একটি ছোট্ট ধাতব গোলক ঘুরতে শুরু করে। সেটি ছিল স্পুটনিক-১ যা মানব ইতিহাসের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। এটি উৎক্ষেপণ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।
এই ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত হানে। লস অ্যান্জেলস টাইমসের প্রথম পাতায় শিরোনাম ছাপা হয়, `সোভিয়েত স্যাটেলাইন সার্কেলিং আর্থ‘। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ হঠাৎ বুঝতে পারে, মহাকাশ প্রযুক্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়তো তাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে।
এরপর আরও বড় ধাক্কা আসে ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল। সোভিয়েত নভোচারী ইউরি গ্যাগারিন মহাকাশযান ভস্টক-১ এ চড়ে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন এবং ইতিহাসের প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশে যান।
এই ঘটনাই মূলত শুরু করে দেয় বিখ্যাত স্পেস রেস।
গ্যাগারিনের সাফল্যের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন, `এই দশক শেষ হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র মানুষকে চাঁদে পাঠাবে এবং নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে।‘
এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই শুরু হয় অ্যাপোলো প্রকল্প। বিশাল বাজেট, হাজার হাজার বিজ্ঞানী এবং নতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি হয় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী বৈজ্ঞানিক প্রকল্পগুলোর একটি।
১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই অ্যাপোলো-১১ মিশনে চাঁদের মাটিতে পা রাখেন নিল আমস্ট্রং। তিনি বলেন , `একজন মানুষের জন্য ছোট পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য বিশাল লাফ।‘
পরবর্তী কয়েক বছরে আরও পাঁচটি মিশন চাঁদে অবতরণ করে। মোট ১২ জন নভোচারী চাঁদের মাটিতে হাঁটেন। তারা ৩৮২ কেজি পাথর সংগ্রহ করেন এবং অসংখ্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা চালান।
তারপর আসে ১৯৭২ সালের ১৪ ডিসেম্বর। চাঁদের মাটিতে শেষ পদক্ষেপ ফেললেন ইউজিন সারনান। অ্যাপোলো ১৭-এর কমান্ডার চাঁদের মাটিতে দাঁড়িয়ে বললেন, `আমরা চলে যাচ্ছি, কিন্তু আমরা ফিরব।‘
কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না দীর্ঘ ৫৩ বছরেও। এর পেছনে শুধু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাই নয় বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতিও বড় কারণ হিসাবে কাজ করেছে।
অ্যাপোলো যুগে নাসার বাজেট ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাজেটের প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু ১৯৭০–এর দশকে এই বাজেট দ্রুত কমে যায়। ১৯৭০ সালের পর প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন অ্যাপোলো ১৮, ১৯ এবং ২০ মিশন বাতিল করেন। ২০১০ সালের দিকে এসে নাসার বাজেট নেমে আসে প্রায় শূন্য দশমিক ৫ শতাংশে।
স্পেস রেস মূলত ছিল এক ধরনের স্নায়ু যুদ্ধ। যুক্তরাষ্ট্র যখন চাঁদে অবতরণ করে, তখন অনেকটাই প্রতিযোগিতা জিতে যায়। ফলে রাজনৈতিক চাপ কমে যায়।
এরই মধ্যে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক আন্দোলনের মতো বিষয়গুলো সরকারের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অ্যাপোলো ১১ ছিল এক বিশাল বৈশ্বিক ঘটনা। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনে সেই দৃশ্য দেখেছিল। প্রতি পাঁচজন মানুষের একজন তখন লাইভ দেখছিলেন টিভিতে। কিন্তু পরবর্তী মিশনগুলো আর তেমন আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারেনি। অনেকের কাছেই চাঁদে যাওয়া যেন স্বাভাবিক হয়ে যায়।
১৯৭০–এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন পরিকল্পনায় মন দেয়। তৈরি হয় পুনঃব্যবহারযোগ্য মহাকাশযান স্পেস শাটল প্রোগ্রাম। পরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তৈরি হয় আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন।
মহাকাশ প্রতিযোগিতা শুধু বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির লড়াই ছিল না; এটি ছিল এক বিশাল প্রচারণার যুদ্ধ। স্নায়ু যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই মহাকাশ সাফল্যকে নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। ১৯৫৭ সালে স্পুটনিক-১ উৎক্ষেপণের পর সোভিয়েত গণমাধ্যম এটিকে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বৈজ্ঞানিক শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে।
এরপর ১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিন মহাকাশে যাওয়ার পর তাকে সোভিয়েত রাষ্ট্রের নায়ক হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রদর্শন করা হয় বিশাল প্যারেড, পোস্টার, সংবাদপত্রের শিরোনাম এবং আন্তর্জাতিক সফরের মাধ্যমে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও পিছিয়ে থাকতে চায়নি। ১৯৬৯ সালে অ্যাপোলো ১১ এর মাধ্যমে নিল আমস্ট্রং যখন চাঁদে পা রাখেন, তখন সেটিকে শুধু বৈজ্ঞানিক সাফল্য নয়, বরং গণতন্ত্র, প্রযুক্তি এবং মুক্ত সমাজের বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার, স্কুলের পাঠ্যবই, রাজনৈতিক বক্তৃতা সব জায়গায় এই সাফল্যকে জাতীয় গৌরবের প্রতীক বানানো হয়।
তবে স্পেস রেসে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এগিয়ে যাওয়ার পর এই প্রচারের তীব্রতাও ধীরে ধীরে কমে যায়, আর চাঁদে যাওয়ার প্রকল্পও আগের মতো রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়নি।
দীর্ঘ বিরতির পর আবারও চাঁদে মানুষের ফেরার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে নাসা পরিচালিত আর্টেমিস প্রোগ্রামের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে আবার চাঁদে পাঠানো এবং সেখানে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ঘাঁটি তৈরি করা।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে শুধু নভোচারীদের চাঁদে অবতরণ করানোই নয়, বরং চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে পানি-বরফসহ গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের সন্ধান করা এবং ভবিষ্যতে মঙ্গলগ্রহে মানব অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়াও পরিকল্পনার অংশ। নাসার পাশাপাশি ইউরোপ, জাপান, কানাডা ও বেসরকারি মহাকাশ কোম্পানিগুলিও এতে যুক্ত হচ্ছে।
যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু এগোয়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মানুষ আবার চাঁদের মাটিতে হাঁটতে পারে এবং তখন ইউজিন সার্নানের সেই অর্ধশতাব্দী পুরোনো কথাটাই হয়তো সত্যি হয়ে উঠবে: মানুষ একদিন আবার চাঁদে ফিরবে।


