ইট-পাথরের দালানকোঠা নির্মাণের চেয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ও মানবিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
রোববার নেত্রকোনার দুর্গাপুরে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি (বিরিশিরি) মিলনায়তনে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে উপজেলা প্রশাসন।
অনুষ্ঠানে এবতেদায়ী ৫ম শ্রেণি, ৮ম শ্রেণি বা সমমান জুনিয়র বৃত্তিপ্রাপ্ত এবং এসএসসি বা সমমান-২০২৬ পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ‘আমাকে আপনারা দয়া করে গতানুগতিক ধারার কোনো রাজনৈতিক কর্মী বা এমপি হিসেবে দেখবেন না। আমি শুধু ইট-পাথরের অট্টালিকা বা দালানকোঠা নির্মাণ করে উন্নয়নের প্রমাণ দিতে চাই না। আমি চাই আমাদের এ অঞ্চলের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও মানবিক উন্নয়ন।’
তিনি বলেন, ‘আজ সাধারণ শাখায় ২৮ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১ জন হচ্ছে আমাদের সুমেশ্বরী কন্যা (নারী শিক্ষার্থী)। আমি স্বপ্ন দেখি, আজকের বিশেষ অতিথির বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে আগামী দিনে দুর্গাপুর-কলমাকান্দা থেকে কেউ একজন এমন পদে আসীন হবে।’
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে গত ২১ আগস্ট শপথ নেওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি কল্পনা করছিলাম এবং প্রত্যাশা করছিলাম, আগামী দিনে কলমাকান্দা-দুর্গাপুরের কোনো সন্তান যেন রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হয়ে শপথ বাক্য পাঠ করে। অভিভাবক হিসেবে আমি সেই স্বপ্নের জায়গাটা বাড়িয়ে দিয়েছি।’
বক্তব্যের একপর্যায়ে এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন বলতে আমি শুধু অট্টালিকা বুঝি না। আমি কাগজ উল্টে দেখছিলাম, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এলাকার তিনটি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাসের হার ৪০ শতাংশের নিচে। এমপিওভুক্ত স্কুলগুলো সরকারি স্কুলের মতো সুযোগ-সুবিধা পায়, তাহলে তাদের ফলাফল কেন এত খারাপ হবে!’
তিনি আরও বলেন, ‘গুজিরকোনার মতো এলাকায় ছেলেদের স্কুল থেকে মাত্র একজন জিপিএ-৫ পেয়েছে, আর মেয়েদের স্কুল থেকে কেউ পায়নি। এটি অত্যন্ত হতাশাজনক। আপনারা আমার কাছে তিন-চারতলা বিল্ডিং চান। আমি হয়তো চারতলা ভবন দিতাম, এখন আমাকে পুনরায় ভাবতে হচ্ছে। কারণ অট্টালিকা দিয়ে কী হবে, যদি সেখান থেকে আমরা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বা ভালো শিক্ষার্থী বের করতে না পারি!’
শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক সবার জন্য শিক্ষক। দয়া করে বাচ্চাদের একটু ভালোভাবে পড়ানোর চেষ্টা করুন। শুধু পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি তাদের মানবিক গুণাবলিতে গুণান্বিত করুন।’
তিনি জাপানের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘জাপানে পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোনো প্রতিযোগিতামূলক একাডেমিক পরীক্ষা নেওয়া হয় না। সেখানে আগে বাচ্চাদের মানবিক গুণাবলিতে গড়ে তোলা হয়। আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে।’
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী কারিগরি শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ বিএ, এমএ পাস করে বেকার থাকতে হলেও টেকনিক্যাল স্কুল-কলেজ থেকে পাস করে কেউ বেকার থাকে না।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা যে যত বড় হই না কেন, সবাই মানুষ। মানুষ হিসেবে যদি কর্মের মাধ্যমে নিজেদের কাছে আত্মতৃপ্তি না পাই, তাহলে মানুষ হওয়ার কোনো সার্থকতা নেই। সততা ও একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করলে কেবল এই আত্মতৃপ্তি লাভ করা সম্ভব।’
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে সার্টিফিকেট ও সম্মাননা ক্রেস্ট বিতরণ করা হয়। এর পাশাপাশি ডেপুটি স্পিকার তার ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে লিও টলস্টয় রচিত ‘একজন মানুষের কী পরিমাণ জমি প্রয়োজন’ শীর্ষক ইংরেজি বইটি উপহার দেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বইটির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বইটির সব অর্থ হয়তো একবারে বোঝা সম্ভব নয়, ডিকশনারি পাশে নিয়ে বইটি পড়বে। তোমাদের ভবিষ্যৎ জীবন গড়ার ক্ষেত্রে এই বইটি অনেক কাজে লাগবে।’
দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আহমেদ সাদাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা। অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।


