দেশে ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের সঙ্গে সম্পর্কিত মামলাগুলোর বিচারের গতি ভীষণ ধীর। এর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে আদালত সংকটের কথা। অর্থাৎ নারী নির্যাতনকারীদের বিচারের জন্য গঠিত ট্রাইব্যুনালেই শিশু-সম্পর্কিত অপরাধের বিচারও করতে হয়। ফলে মামলার সংখ্যা বেড়ে যায়, বিচার প্রক্রিয়াও হয় দীর্ঘায়িত।
আইন বিশেশজ্ঞ, আইনজীবী এবং আদালত কর্মকর্তারা মনে করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোর ওপর চাপ কমানোর জন্য শিশু সংক্রান্ত অপরাধের বিচারে আলাদা আদালত গঠন করা জরুরি। বিশেষ করে ধর্ষণ শিকার নারীদের জন্য, যেন তারা সময়মতো ন্যায়বিচার পায়।
ধর্ষণকে দেখা হয় সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে। কিন্তু দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ক্রমেই এই ঘটনা বাড়ছে। বিভিন্ন সময়ই ধর্ষণের দ্রুত বিচার চেয়ে বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হয়েছে।
এই দাবি আরও তীব্র হয়ে ওঠে মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যার পর। এই ঘটনায় বিক্ষুব্ধ মানুষ সরকারকে বিদ্যমান প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করতে বাধ্য করে।
আছিয়ার মৃত্যুর পর আইন উপদেষ্টা আসিফ নাজরুল বলেছিলেন, ধর্ষণ মামলার বিচারকাল ১৮০ দিনের পরিবর্তে ৯০ দিন করা হবে এবং তদন্ত সময় ৩০ দিন থেকে কমিয়ে এর অর্ধেক করা হবে।
তবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোর ওপর চাপ না কমালে কীভাবে ৯০ দিনের মধ্যে ধর্ষণ মামলার বিচার শেষ করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।
ঢাকার নিম্ন আদালতে মোট নয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। এই ট্রাইব্যুনালগুলোয় মূলত নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার শুনানি হয়। নারী ও শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌতুক, যৌতুকের দাবিতে মারধর ইত্যাদি মামলার বিচার হয় এসব ট্রাইব্যুনালে।
শিশুসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধরনের অপরাধের বিচার করতে ২০১৩ সালে শিশুদের জন্য আলাদা একটি আইন করা হয়। তবে আইন করা হলেও দেশে কোথাও শিশুদের বিচারের জন্য আলাদা আদালত গঠন করা হয়নি। শুরুতে দেশের জেলা ও দায়রা জজ আদালতগুলোকে শিশু আদালত হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। তারপর ২০১৮ সালে একটি বিল পাস হয়, যার মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোকে শিশু আদালত হিসেবে গণ্য করা হয়।
বাংলাদেশে যদি ১৮ বছরের নিচে কেউ অপরাধ করে, তবে তার বিচার শিশু আইন অনুযায়ী করা হয়, সাধারণ দণ্ডবিধি অনুযায়ী নয়। ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী, অপরাধ যত বড়ই হোক না কেন, ১৮ বছরের নিচে কোনো শিশুকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার কোনো বিধান নেই।
২০১৮ সাল থেকে ঢাকা শহরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোকে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার মামলা ছাড়াও শিশু আইনের মামলার বিচার করতে হচ্ছে।
আদালতের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা শহরের নয়টি ট্রাইব্যুনালে ১৮ হাজার ৯২৮টি মামলা বিচারাধীন। যার ২১ শতাংশ অর্থাৎ ৩ হাজার ৯৭৩টিই শিশু আইনের মামলা।
এই চাপ কেবল ঢাকার ট্রাইব্যুনালেই নয়, দেশের সবখানেই বিদ্যমান। বাংলাদেশ জুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোয় ১ লাখ ৫১ হাজার ৩১৭টি মামলা বিচারাধীন। যার মধ্যে ৪২ হাজার ৫৬৯টি শিশু মামলা। যা মোট মামলার ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশু আইনের মামলার অতিরিক্ত চাপের কারণে ধর্ষণসহ নারী বিরুদ্ধে সহিংসতার অন্য মামলাগুলোর বিচারে দেরি হচ্ছে। মামলার সংখ্যা বেশি হওয়ায় শুনানির তারিখের মধ্যে দীর্ঘ ফারাক সৃষ্টি হচ্ছে।
আদালত কর্মকর্তারা বলছেন, শিশু আইনের মামলার বিচারের জন্য আলাদা নিয়ম ও বিধিমালা রয়েছে। এই মামলাগুলো মোকাবিলায় অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়।
ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের এক কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘চাপের কারণে ধর্ষণ মামলার শুনানির তারিখ অনেক দিন পিছিয়ে যাচ্ছে। আবার, অনেক সময় দেখা যায় নির্দিষ্ট তারিখে সাক্ষী হাজির হয় না। এসব কারণে ধর্ষণ মামলার বিচার স্থবির হয়ে পড়ছে। যদি শিশু আদালত আলাদা করা যায়, তাহলে বিচারকদের ওপর মামলার চাপ কমে যাবে। তারা শুধুমাত্র ধর্ষণ মামলার বিচার করতে পারবেন। আমাদের কাজের চাপও কিছুটা কমবে।’
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘শিশু আদালত আলাদা হলে ভালো হবে। এতে বিচারাধীন মামলাগুলোর সংখ্যা কমে আসবে। ধর্ষণ মামলার শুনানি দ্রুত হবে এবং দ্রুত ফলাফল পাওয়া যাবে।’
আরেক পিপি ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘যদি আরও আদালত থাকে, তবে মামলার চাপ কমবে। সরকার শিশু আদালত আলাদা করার উদ্যোগ নিচ্ছে। যদি শিশুদের বিচার করার জন্য আলাদা আদালত গঠিত হয়, তবে বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে।’
ধর্ষণ মামলার তদন্তে ধীরগতি
চলতি বছরের মার্চে, সরকার ধর্ষণ মামলার তদন্তের সময় কমাতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধনী আনে। এখন তদন্ত কর্মকর্তাদের অবশ্যই আসামিকে গ্রেপ্তার করার ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়। আর যদি যথাযথ কারণ দেখাতে পারেন তাজলে আরও ৩০ দিন সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকে। যদি অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা না হয়, তাহলে অভিযোগ দায়েরের ৬০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
এই সংশোধনীর পরেও তদন্ত প্রক্রিয়া ধীরগতিতেই চলছে। আদালতের সূত্রগুলো বলছে, বেশিরভাগ তদন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয় না।
হাজারীবাগে গত ২০ মার্চ ধর্ষণের শিকার হন এক নারী। পরে ১৩ মে মামলা করেন তিনি। এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো জমা দেওয়া হয়নি। এ পর্যন্ত ছয়বার তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে, সবশেষ ৭ অক্টোবর প্রতিবেদন জমার সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকায় গত ৬ জুন এক পলিটেকনিক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে তার সহপাঠী। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মামলা করলেও সেই মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। চারবার দিন পেছানোর পর ৯ অক্টোবর নতুন তারিখ ঠিক রয়েছে।
আইন সংশোধনের পরও ধর্ষণ মামলার তদন্তে দেরি হচ্ছেই।
তদন্তকারীরা বলছেন, ঘটনার তদন্তের জন্য এত কম সময় বেধে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। কারণ বাস্তবে আসল অপরাধীদের শনাক্ত করতে অনেক সময় লাগে। চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রমাণও সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে যদি ঘটনার কয়েক মাস পর মামলা করা হয় তাহলে। আবার অভিযুক্ত পালিয়ে গেলেও তা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
তারা আরও বলেন, বাংলাদেশে একটি মাত্র ডিএনএ পরীক্ষার ল্যাবরেটরি রয়েছে। যেটির অবস্থান সিআইডি সদর দপ্তরে। যেখানে অনেক মামলার প্রমাণ জমে থাকে। সংবেদনশীল মামলা হলে হয়ত দ্রুত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রতিবেদন পেতে চার মাসও লেগে যায়।
সব মিলিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয় না বলেও জানান তারা।
এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ভুক্তভোগী যদি দ্রুতও মামলা করে, অভিযুক্তকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা যায়, তবুও ডিএনএ রিপোর্ট পেতে তিন থেকে চার মাস সময় লেগে যায়।’
ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচারের জন্য এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা ভীষণ কষ্টদায়ক।
এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘ছয় মাস হয়ে গেছে, তদন্ত শেষ হয়নি, অভিযুক্তও গ্রেপ্তার হয়নি। আমি এখনও ন্যায়বিচার পাইনি।’
এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক ভুক্তভোগীই মামলা শেষ করার বিষয়ে উৎসাহ পান না বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। আবার সাক্ষীর উপস্থিতিও মামলা শেষ করার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘ধর্ষণ মামলার তদন্ত প্রায় ছয় মাস থেকে দুই বছর সময় নেয়। তারপর, যখন মামলা শুরু হয়, সাক্ষীর উপস্থিতির সমস্যা আরও বিলম্ব সৃষ্টি করে। এর উপর, ট্রাইব্যুনালগুলো অন্য নারী নির্যাতন মামলার সঙ্গে শিশু আইনের মামলার চাপ বহন করছে।’
শুধুমাত্র ধর্ষণ মামলাগুলোর জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হলে তা দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, ‘এটি করা গেলে, তা হবে একটি বিপ্লবী পদক্ষেপ।’
এ বিষয়ে কথা বলতে আইন ও বিচার বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নাজরুল এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিব (বর্তমান দায়িত্ব) লিয়াকত আলী মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।


