শিক্ষার্থীদের ‘জাতির শত্রু’ মনে করছে মোদি সরকার: সোনিয়া গান্ধী

শিক্ষার্থীদের ‘জাতির শত্রু’ মনে করছে মোদি সরকার: সোনিয়া গান্ধী
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সোনিয়া গান্ধীর সমর্থন। ছবি: পিটিআই
Advertisement
Advertisement

ভারতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছেন বিরোধীদল কংগ্রেসের চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী। তিনি অভিযোগ করেছেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দেশের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী হিসেবে নয়, বরং ‘জাতির শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করছে।

শুক্রবার প্রকাশিত ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে এ মন্তব্য করেন তিনি।

সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কেবল জবাবদিহি ও শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার দাবি করেছে। কিন্তু তাদের সাহসের জবাবে মোদি সরকার কাপুরুষতা এবং নির্বিচার নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে। দেশের ভবিষ্যতের উত্তরাধিকারী হিসেবে নয়, বরং তাদের সঙ্গে জাতির শত্রুর মতো আচরণ করা হয়েছে।’

সোনিয়া গান্ধীর দাবি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর অধীনে পরিচালিত ভারতীয় পুলিশ বাহিনী বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর যে ‘নির্মমতা’ চালিয়েছে, তা মোদি সরকারের ক্ষেত্রে নতুন নয়।

২০২০ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনবিরোধী আন্দোলনে পুলিশের সঙ্গে সাধারণ জনগণের সংঘর্ষের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘সে সময় সশস্ত্র পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী যেভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে অভিযান চালিয়েছিল, তা এখনও মানুষের স্মৃতিতে রয়েছে। একইভাবে ভারতের নারী কুস্তিগীরদের বিরুদ্ধে চালানো কঠোর ব্যবহারের ঘটনাও ভুলে যাওয়ার নয়।’

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতির প্রতিবাদে গোটা ভারতজুড়ে ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠে। ধীরে ধীরে তাদের সমর্থন জানিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন ভারতীয় কংগ্রেস জোটসহ বিরোধী দলীয় নেতারা।

গত ২০ জুলাই সিজেপি দেশটির পার্লামেন্ট অভিমুখে ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রার কর্মসূচিতে পুলিশি বাধার মুখে পড়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের। সেদিকে ইঙ্গিত করে সোনিয়া গান্ধী ২০ জুলাইকে ‘কলঙ্কের দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘ওই দিন দিল্লি পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে আন্দোলন দমন করার চেষ্টা করে। তাদের আগ্রাসনে বহু শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী আহত হন। এমনকি যেসব শিক্ষার্থী বাড়ি ফিরছিলেন, তারাও পুলিশের আক্রমণ থেকে রেহাই পাননি। পুলিশ নির্বিচারে তাদের লাঠিপেটা করেছে।’

সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘দেশের মানুষ এমন সব হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখেছে, যেখানে তরুণ-তরুণীদের শরীর ছররার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। এমন অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ নিজেই দিয়েছেন, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।’

আরও পড়ুন

‘সেদিনের ভিডিওগুলো আমাদের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে গেছে এবং আমাদের সবার বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এখন সময় এসেছে উচ্চস্বরে বলার-থামুন, এরা আমাদেরই ছেলে-মেয়ে, আমাদেরই ভবিষ্যৎ’, যোগ করেন কংগ্রেস নেত্রী।

সোনিয়া গান্ধীর অভিযোগ, ভিন্নমতকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তকমা দেওয়া মোদি সরকারের পুরোনো কৌশল। এখন সেই একই কৌশল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে দুর্বল করতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আন্দোলনের কারণ নিয়ে আত্মসমালোচনা করার পরিবর্তে মোদি সরকার নানা ষড়যন্ত্রের গল্প ছড়াচ্ছে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সন্দেহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে।’

‘মোদি সরকার ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবনতির দিকে ঠেলে দিয়েছে’ দাবি করে তিনি বলেন, ‘দেশের শিক্ষার্থীরা সরকারের প্রকৃত চেহারা উন্মোচন করে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা নৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।’

আজকের হতাশাজনক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং মোদি সরকারের ঔদ্ধত্য, জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়া ও গঠনমূলক আলোচনায় অনীহাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের স্বাভাবিক কারণ বলে মনে করেন সোনিয়া গান্ধী।

তার মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সরকারি শিক্ষার ক্ষেত্র থেকে মোদি সরকারের ধারাবাহিক সরে আসা। উদাহরণ হিসেবে তিনি স্কুল শিক্ষায় মোট বাজেটের বরাদ্দ ৫০ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষায় ৩৩ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার কথা বলেন।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এমন অযৌক্তিকভাবে শিক্ষাখাতে বাজেট কমিয়ে দেওয়ার কোনো যুক্তি কি কেউ দেখাতে পারেন?’

সোনিয়া গান্ধীর দাবি, গত ১২ বছরে মোদি সরকার প্রায় এক লাখ সরকারি স্কুল বন্ধ করেছে। একই সময়ে ৪৩ হাজার বেসরকারি স্কুল চালু হয়েছে, যার মালিকানার বড় একটি অংশ রাষ্ট্র ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলোর পরিচালনায় রয়েছে। তার ভাষায়, ‘এই সংগঠনগুলোই ভারতের সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিদ্যালয় নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে।’

সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘মানসম্মত ও সাশ্রয়ী সরকারি শিক্ষা মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় পরিবারগুলো সন্তানদের পড়াশোনার জন্য নিজেদের পকেট থেকেই বিপুল অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে শিক্ষা বিষয়ে জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়া এবং আন্তরিক আলোচনায় না বসার মোদি সরকারের ধারাবাহিক নীতি।’

কেন্দ্র সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানেরও সমালোচনা করেন সোনিয়া গান্ধী। তার অভিযোগ, জাতীয় পরীক্ষা সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য সংসদের শিক্ষা বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সুপারিশকে শুধু সেখানে বিরোধী দলের সদস্য থাকায় প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করে তিনি জবাবদিহির প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এত বড় ব্যর্থতার পরও ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে অস্বীকৃতি জনমতকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad