খালি পেট আর পকেটে সম্বল মাত্র ৭০ টাকা। এই নিয়ে ভাড়ায় চালিত রিকশাটি নিয়ে সকালে বের হয়েছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। আশা ছিল দিনভর যাত্রী টানলে রাতে পরিবারের মুখে অন্তত একবেলা অন্ন জুটবে।
কিন্তু রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড়ে এসে থমকে যায় রাজ্জাকের চাকা, থমকে যায় তার বাঁচার লড়াই। সামনে জনসমুদ্র, পেছনে ফেরার পথ নেই। দীর্ঘ সাড়ে চার ঘণ্টা একই জায়গায় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে রাজ্জাকের চোখেমুখে এখন কেবলই ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তার ছাপ। পকেটের শেষ ৭০ টাকা খরচ করার সাহস তার নেই, কারণ আজ আয় না হলে কাল উপোস থাকতে হবে।
অসহায়ত্বের চরমে পৌঁছে রাজ্জাক বারবার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সামনে গিয়ে কাঁপা গলায় অনুরোধ করেন, “বাবা, আমরা গরিব মানুষ। সকাল থেকে কিছু খাই নাই। একটু রাস্তা ছেড়ে দেও।” কিন্তু দাবি আদায়ের নেশায় বুঁদ শিক্ষার্থীদের মন গলেনি। একপর্যায়ে ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আত্মসংযম হারিয়ে তিনি এক শিক্ষার্থীর হাত ধরে আর্তনাদ করে বলেন, “তোমাদের যা দাবি আমাদের বলো, দরকার হলে আমরা তোমাদের জন্য ইউনুসের কাছে যাব। তাও এই ক্ষুধা আর সহ্য হয় না, আমার গলা টিপে মেরে ফেলো।”
বৃহস্পতিবারের এই দৃশ্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং সাত কলেজকে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’ (ডিসিইউ) করার অধ্যাদেশ জারির দাবিতে শিক্ষার্থীদের অবরোধে জিম্মি হয়ে পড়া হাজারো মানুষের প্রতিচ্ছবি।
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশ জারির দাবিতে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে সায়েন্সল্যাব মোড় অবরোধ করেন ঢাকা কলেজ, ইডেন ও বদরুন্নেসা কলেজের শিক্ষার্থীরা। এর প্রভাবে ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, কলাবাগান ও আজিমপুর এলাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট।
এই অবরোধে সায়েন্সল্যাবেই আটকে পড়েন সদরঘাট থেকে মিরপুরগামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নাফিজ। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ক্ষোভ নিয়ে তিনি বলেন, “এই শহর আর বাসযোগ্য নেই। যার যেখানে ইচ্ছা রাস্তা আটকাচ্ছে। না সরকার, না প্রশাসন, কারও কোনো দায় নেই।”
নাফিজের ক্ষোভ আরও তীব্র হয়ে ওঠে শোভনের কণ্ঠে। অসুস্থ বাবাকে দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকেন তিনি। রাগ আর হতাশা নিয়ে বলেন, “এরা ছাত্র নামের কলঙ্ক। নিজেদের দাবির জন্য এভাবে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা অন্যায়। আন্দোলনের পর আন্দোলন, ইউনুস সরকারের কি কোনো দায় নেই?”
পুরো সময়ে পুলিশ ছিল কেবলই দর্শক। দায়িত্বরত এক পুলিশ সদস্য বলেন, “জনগণ প্রতিক্রিয়া না দেখালে আমরা শিক্ষার্থীদের ওপর হাত তুলতে পারি না।” বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের পরবর্তী পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন অনেক বেশি সতর্ক। যার ফলে মাঠপর্যায়ে তাদের নিষ্ক্রিয়তা সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এই গণভোগান্তির মূলে রয়েছে সাত সরকারি কলেজের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সংকট। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশের খসড়া ১৩ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে যাবে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা কোনো দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় যেতে নারাজ; তাদের দাবি এখনই আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তী প্রশাসক অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরতে বললেও তারা তা মানতে নারাজ।
বেলা গড়িয়ে বিকেল হয়, মিছিলের শব্দ আরও জোরালো হয়। কিন্তু এই উচ্চকিত স্লোগানের আড়ালে হারিয়ে যায় আব্দুর রাজ্জাকদের মতো হাজারো শ্রমজীবী মানুষের হাহাকার। রাষ্ট্র, অধ্যাদেশ কিংবা প্রশাসনিক মারপ্যাঁচের চেয়েও তাদের কাছে বড় বাস্তবতা হলো এক মুঠো ভাত। দাবির আড়ালে সাধারণ মানুষের জীবন এভাবে জিম্মি হওয়া নিয়ে খোদ নগরবাসীর মনেই এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।


