যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের নোবেল পুরস্কার উৎসর্গ করেছেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের স্বীকৃতি হিসেবে শুক্রবার নোবেল শান্তি পুরস্কার জয় করেন মাচাদো।
নোবেল জয়ের পর আত্মগোপনে থাকা এই নেত্রী এক এক্স পোস্টে বলেন, ‘এই পুরস্কার আমি উৎসর্গ করছি ভেনেজুয়েলার কষ্টে থাকা জনগণ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে, যিনি আমাদের সংগ্রামে দৃঢ় সমর্থন দিয়েছেন!’
মাচাদোর সঙ্গে ফোনালাপের কথা নিজেও নিশ্চিত করেছেন ট্রাম্প। সিএনএন জানিয়েছে, তিনি ‘খুব দারুণ ছিলেন’ মন্তব্য করে ট্রাম্প বলেন, ‘যিনি সত্যিই নোবেল পেয়েছেন তিনি আমাকে ফোন করে বলেছেন, আপনার সম্মানে এটি গ্রহণ করছি, কারণ আপনিই এটির যোগ্য।’
এরপর মজা করে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি বলিনি, “তাহলে সেটা আমাকে দাও।” যদিও আমি মনে করি, তিনি হয়তো বলেই দিতেন। তিনি খুব ভালো ছিলেন।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘পুরো সফরে আমি তাকে সাহায্য করেছি। ভেনেজুয়েলায় ওদের অনেক সাহায্য দরকার। আপনি বলতে পারেন, ২৪ সালের কাজের জন্য এটা দেওয়া হলো আর আমি তখন নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।’
এর আগে বহুবার নিজেকে নোবেল পাওয়ার যোগ্য বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অবশ্য তিনি এটিও বলেছেন, বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তার প্রয়াস ‘নোবেল পাওয়ার জন্য নয়’ বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য যুদ্ধহীন পৃথিবী উপহার দিতেই তার প্রশাসন কাজ করছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে শান্তিতে নোবেল না দেওয়ায় এবারের কমিটির কড়া সমালোচনা করেছে হোয়াইট হাউস। গাজায় ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধবিরতির অবিশ্বাস্য চুক্তিকে সফল করা সত্ত্বেও তাকে শান্তিতে নোবেল না দেওয়াকে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হিসেবে মনে করছেন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তারা।
হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র স্টিভেন চিউং এক্স পোস্টে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তি চুক্তি করে যাচ্ছেন, যুদ্ধ বন্ধ করছেন, জীবন রক্ষা করছেন… আর নোবেল কমিটি তাকে স্বীকৃতি না দিয়ে প্রমাণ করেছে- তারা শান্তির চেয়ে রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।’
এদিকে শান্তিতে নোবেল জেতার পর কমিটির সেক্রেটারি ক্রিস্টিয়ান বার্গ হার্পভিকেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন মাচাদো। সামাজিক মাধ্যমে সে ফোনালাপ প্রকাশ করে নোবেল কমিটি। এতে মাচাদো বলেন, ‘হে ঈশ্বর… আমি কিছু বলতে চাই না। আমার কোনো কথা নেই।’
হার্পভিকেনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আশা করি আপনি বুঝতে পারবেন, এটি ন্যায়ের পক্ষে ভেনেজুয়েলার মানুষের আন্দোলন। আমি একা এই পুরস্কারের যোগ্য নই। এটি (নোবেল) পুরো সমাজের অর্জন। ’

মাচাদো নিজের পুরস্কার ভেনেজুয়েলার জনগণ ও ট্রাম্পকে উৎসর্গ করে যেন বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের অবদানকেই স্বীকৃতি দিলেন। শুধু তাই নয়, ভেনেজুয়েলার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর কট্টর বিরোধী মাচাদো দেশটির ‘স্বৈরাচার বিরোধী’ আন্দোলনে ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থনও পেয়েছেন।
ট্রাম্প নিজেও প্রেসিডেন্ট মাদুরোর একজন কঠোর সমালোচক। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ তার সরকারকে বৈধ বলেও স্বীকার করে না। ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ২০২৪ সালে সেনেটর থাকাকালে মার্কিন কংগ্রেসের একটি দলের সঙ্গে মাচাদোকে শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেন।
২০১৩ সাল থেকে মাদুরো টানা ১২ বছর ধরে ভেনেজুয়েলার ক্ষমতা ধরে রাখায় রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি মারাত্মক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখে পড়েছেন দেশটির সাধারণ জনগণ। তাদের ক্ষোভ, নির্বাচনী বিতর্ক, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও আহ্বান চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৃতীয় মেয়াদে অনেকটা জোরপূর্বক শপথ নেন মাদুরো।

২০২৪ সালে ভেনেজুয়েলার আদালত বিরোধী মাচাদোকে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হওয়া থেকে বাধা দেওয়ায় তিনিও মাদুরোর বিরুদ্ধে নির্বাচন করতে পারেননি। বরং সরকারের আক্রোশ থেকে প্রাণ বাঁচাতে আত্মগোপনে চলে যান। এমনকি ১০ ডিসেম্বর অসলোতে নোবেল পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারবেন কি না, তা নিয়েও শঙ্কা আছে।
নোবেল কমিটি এক বিবৃতিতে শান্তির জন্য মাচাদোকে বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে জানায়, ‘যখন স্বৈরাচারীরা ক্ষমতা দখল করে, তখন স্বাধীনতার সাহসী রক্ষকদের স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি। কারণ তারাই সব বাধা ভেঙে উঠে দাঁড়ান এবং প্রতিরোধ করেন।’
মাচাদো প্রথম ভেনেজুয়েলান ও ষষ্ঠ লাতিন আমেরিকান, যিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস এই পুরস্কারকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি ‘ভেনেজুয়েলার জনগণের মুক্ত এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য স্পষ্ট আকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতি।’

নোবেল কমিটির প্রধান জোয়েরগেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস বলেন, তিনি আশা করেন এটি ভেনেজুয়েলার স্বৈরাচার সরকারের বিরোধী পক্ষকে আরও উৎসাহ দেবে। অবশ্য গাজা যুদ্ধ ও রাশিয়া-ইউক্রেন সঙ্ঘাত বন্ধের চেষ্টা করায় ২০২৬ সালের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প নোবেলের জন্য বিবেচিত হবেন কিনা- সে বিষয় পরিষ্কার করেননি নোবেল কমিটির প্রধান ফ্রাইডনেস।
তিনি বলেন, ‘অন্যদের কী করা উচিত, তা বলা আমাদের কাজ নয়। আমাদের কাজ শান্তি পুরস্কার দেওয়া। তাই পরের বছর কী হয়, দেখা যাক।’
এর আগে ২০২৪ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার জেতে জাপানি সংগঠন নিহোন হিদানকিও। তারা হিরোশিমা ও নাগাসাকির পরমাণু বোমা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে যুদ্ধ ও সংঘাত বিরোধী আন্দোলন করে থাকেন।


