শত বছরের ইতিহাস আর স্মৃতির ভার বয়ে নেওয়া লাকুটিয়ার জমিদার বাড়ি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অযত্ন শেষে ফিরছে পুরোনো রূপে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে সম্প্রতি শেষ হয়েছে প্রথম ধাপের সংস্কারকাজ, যা নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে ইতিহাসপ্রেমী ও স্থানীয়দের।
বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার লাকুটিয়া এলাকায় গেলেই দূর থেকে চোখে পড়ে এক পুরোনো প্রাসাদসম বাড়ি। যে বাড়ির দেয়ালে ছিল গভীর ক্ষয়, ছাদের টালি ঝরে পড়েছিল বহু আগেই। শেওলাধরা বারান্দা, ভেঙে পড়া নকশা, এসব মিলিয়ে জমিদার বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।
অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসা এই স্থাপনাকে পুরোনো রূপে ফিরিয়ে আনতে প্রথম পর্যায়ের সংস্কারকাজ শেষ হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর গত বছরের ৪ মে থেকে সংস্কারকাজ শুরু করেছিল। এ সময় ভবনের পুরোনো ছাদ সম্পূর্ণ তুলে ফেলা হয়েছে। সাতক্ষীরা থেকে আনা টালি দিয়ে নতুন ছাদ বসানো হয়েছে। ভবনের চারপাশে তৈরি হয়েছে নতুন গোলাকার ইটের পিলার, যা ভবনের গঠনকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করবে।
বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান আরিফুর রহমান বলেন, ‘প্রথম ধাপে প্রায় ৬০ লাখ টাকায় মূল ভবনের ভিত্তি, ইটের গাঁথুনি আর ছাদ সংস্কারের কাজ শেষ হয়েছে। চারপাশে সাদা রঙ করা হয়েছে। যেটা বৃষ্টি থেকে ভবনকে সুরক্ষিত রাখবে। এছাড়াও ভবনের দরজা, জানালা ও মেঝে দ্বিতীয় ধাপের সংস্কারের সময় সংযুক্ত করা হবে। ঐতিহাসিক এই ভবন রক্ষায় খুব তাড়াতাড়ি দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হবে।’
প্রথম ধাপের সংস্কারের পর দেখা যায়, ভবনের চারপাশে সেই পুরোনো কাঠামো ফিরে এসেছে। দেয়ালের পুরোনো অংশ ধরে রাখতে দেওয়া হয়েছে ধাতব সাপোর্ট। ভেতরের ঘরগুলো সংস্কার করা হয়েছে। ভবনের বিম বা পিলারের ফাঁকে ফাঁকে পচে যাওয়া কাঠের কাঠামো সরিয়ে, সেখানে নতুন কাঠ দেওয়া হয়েছে। সেই কাঠ আবার বার্নিশ করা হয়েছে। ভবনের ভেতরটা এখন বেশ ঝকঝকে পরিষ্কার।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা-বরিশাল অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন বলেন, ‘পুরনো ছবি, নথি এবং স্থানীয়দের বর্ণনা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছি। লক্ষ্য একটাই, ভবনটিকে তার আদিরূপের যতটা কাছে নিয়ে যাওয়া যায়।’
লোকমুখে জানা যায়, জমিদার রূপচন্দ্র রাই ছিলেন লাকুটিয়া জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তার নাতি রাজচন্দ্র রায়ের সময় জমিদারির পরিধি বাড়ে। প্রায় ৫০ একর জমির ওপর তিনি নির্মাণ করেন এই বাড়ি। রূপচন্দ্র রায়ের সন্তানরা ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত ছিলেন। এ পরিবারেরই এক সদস্য বিখ্যাত বৈমানিক ইন্দ্রলাল রায়, অন্যজন নাম করা বক্সার পরেশলাল রায়। শুধু বাংলাদেশ নয় ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এই দু’টি নাম বেশ আলোচিত। এই পরিবারের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা ছিল। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুই ছেলে অরুণেন্দ্রনাথ ও দীপেন্দ্রনাথ বিয়ে করেন রাজচন্দ্র রায়ের নাতনি সুশীলা ও চারুবালাকে।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রায় আট দশমিক ২০ মিটার উচ্চতা, ২৫ দশমিক ৪০ মিটার দৈর্ঘ্য ও নয় দশমিক ২০ মিটার প্রস্থের এই দোতলা ভবনে মোট নয়টি কক্ষ আছে। ভবনের সামনে ও পেছনের তিনটি বাঁধানো পুকুর স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘বাবুর পুকুর’ নামে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী লিঙ্কন বায়েন বলেন, ‘সংস্কার প্রশংসনীয়, কিন্তু ভবনের পাশের গুদাম না সরালে এর প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব কমে যাবে।’
২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ায় থাকা জমিদার পরিবারের উত্তরাধিকারী আলপনা রায় চিঠি লিখে এই বাড়ি সংরক্ষণের দাবি জানান। তার বাবা পঙ্কজ রায় চৌধুরীর কাছেই তিনি লাকুটিয়ার জমিদার বাড়ির গল্প শুনেছেন।
আলপনা রায় বলেন, ‘বাবার মুখে জমিদার বাড়ির বহু পুরনো কাহিনি শুনেছি। এটি শুধু আমাদের পরিবারের নয়, বরিশালের ইতিহাসের বড় অংশ। এই ভিটায় রবীন্দ্রনাথের আত্মীয়তার ছায়া যেমন রয়েছে, তেমনি বুকারজয়ী লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের সঙ্গেও আমাদের পরিবারের উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পর্ক। বাড়িটির ঐতিহাসিক মর্যাদা ভেবেই ২০১৮ সালে সরকারকে সেটি সংরক্ষণের আরজি জানিয়েছিলাম। সে অনুযায়ী প্রথম ধাপের সংস্কার শেষ হয়েছে শুনে সত্যি দারুণ লাগছে।’
সাংস্কৃতিক কর্মী সুশান্ত ঘোষ বলেন, ‘ছোটবেলায় এই বাড়ির সঙ্গে একটা সম্পর্ক ছিল। ধীরে ধীরে বাড়িটা ভেঙে যেতে দেখেছি। সংস্কারের জন্য চারুকলা বরিশালের উদ্যোগে সামাজিক কর্মসূচি পালন করেছি। এখন কাজ শুরু হয়েছে, আমরা চাই এটা পুরোপুরি সংরক্ষিত হোক।’


