রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কমিশনিং বা পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলাকালে একটি কারিগরি বিচ্যুতি শনাক্ত হয়েছে। তবে তা নিয়ে আতঙ্ক বা বিভ্রান্তির কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছে কেন্দ্রটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে এ ধরনের ক্ষুদ্র ত্রুটি শনাক্ত ও সংশোধন করা কমিশনিং প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ। এবং এসব পরীক্ষায় সামান্য বিচ্যুতি শনাক্ত হওয়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতারই প্রমাণ।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কার্যক্রম শুরুর আগেই গুরুতর কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বলে প্রচারিত হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। তবে এসব তথ্যকে বিভ্রান্তিকর ও অবাস্তব উল্লেখ করে তা নাকচ করেছেন এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহেদুল হাসান।
সোমবার গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তাই আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ বিষয়ে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। কিছু মহলের প্রচারিত বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য অযথা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, যার সঙ্গে প্রকৃত পরিস্থিতির কোনো মিল নেই।’
জাহেদুল হাসান জানান, কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একাধিক নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। এসব পরীক্ষায় সামান্য বিচ্যুতি শনাক্ত হওয়া বরং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতারই প্রমাণ।
তিনি বলেন, সেকেন্ডারি সার্কিটে ৮ দশমিক ১ মেগাপাস্কাল (এমপিএ) চাপে পরিচালিত লিক টাইটনেস টেস্ট একটি বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত পরীক্ষা। কেন্দ্র প্রতিবার শাটডাউন অবস্থা থেকে অপারেশনাল অবস্থায় যাওয়ার সময় এ পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। পারমাণবিক ও বিদ্যুৎ উৎপাদন শিল্পে এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রচলিত প্রক্রিয়া।
তিনি আরও বলেন, পরীক্ষার সময় নির্ধারিত গ্রহণযোগ্যতার মানদণ্ডের তুলনায় একটি কারিগরি বিচ্যুতি শনাক্ত হয়। কঠোর নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ছোট বিচ্যুতিকেও গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তা অনুমোদন দেওয়া হয় না।
তিনি আরও বলেন, ‘এই বিচ্যুতি শনাক্ত হওয়াই প্রমাণ করে যে প্রকল্পের নিরাপত্তা ও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা যথাযথভাবে কাজ করছে।’
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও পরমাণু বিজ্ঞানী শফিকুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি লোডিং বা কমিশনিং পর্যায়ে এ ধরনের ক্ষুদ্র কারিগরি বিষয় শনাক্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোনো বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকলে প্ল্যান্ট শাটডাউন করতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতি সে ধরনের নয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, রূপপুর প্রকল্পকে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প ও সুনামির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম করে গড়ে তুলতে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রথম প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের ভিত্তিতে রূপপুরে আরও দুটি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক বিদ্যুৎ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যান্য অনেক জ্বালানি উৎসের তুলনায় অধিক সাশ্রয়ী হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রথম ইউনিটে গত ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হয়েছে এবং বর্তমানে কমিশনিং কার্যক্রম চলছে। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ ও প্রস্তুতিমূলক কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হবে। সেপ্টেম্বরে দুটি ইউনিট থেকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।


