রূপপুরকে ঘিরে ঈশ্বরদীতে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

রূপপুরকে ঘিরে ঈশ্বরদীতে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশীতে উন্মোচন হয়েছে পর্যটনের এক নতুন দিগন্ত। শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, লালন শাহ সেতু, পদ্মা নদীর প্রমত্তা রূপ ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সহাবস্থান এখানে তৈরি করেছে এক অপরূপ সৌন্দর্যের মেলবন্ধন। এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিন, বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে এখানে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসু হাজারো মানুষ।

তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় পর্যটন অবকাঠামোর অভাব এবং নানা নাগরিক সমস্যার কারণে দর্শনার্থীদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

পাকশীর রূপপুর মোড় থেকে কুষ্টিয়ার অভিমুখে যাত্রা করলেই প্রথমে চোখে পড়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর কিছু দূর এগিয়ে লালন শাহ সেতুতে ওঠার ঠিক আগে ডান দিকে মোড় নিয়ে পদ্মা নদীর তীরে পৌঁছানো যায়। সেখানে দাঁড়ালেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। তার ঠিক পাশেই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক লালন শাহ সেতু। নিচে পদ্মা নদীর বয়ে চলা আর ওপর দিয়ে ট্রেনের চিরচেনা ঝমঝম শব্দ সব মিলিয়ে এক অন্যরকম মোহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে, যা যেকোনো দর্শনার্থীকে মুগ্ধ না করে পারে না।

পাবনা জেলায় সাধারণ মানুষের ঘুরে বেড়ানোর মতো উল্লেখযোগ্য তেমন কোনো বিনোদন কেন্দ্র বা দর্শনীয় স্থান নেই। সে কারণে স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসুদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ঈশ্বরদীর পাকশী। এই নদীর তীর, পাশাপাশি দুটি সেতু এবং অদূরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুউচ্চ চুল্লীগুলো এক অনন্য দৃশ্যপট তৈরি করেছে। বিশেষ করে পড়ন্ত বিকালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখার লোভ সামলানো যেকোনো মানুষের পক্ষেই কঠিন। সাধারণ দিনে দর্শনার্থীদের আনাগোনা থাকলেও সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এখানে দেখা যায় উপচে পড়া ভিড়।

পাকশীর এই ভৌগোলিক ও পরিবেশগত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে সরকার যদি পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তবে এখানে একটি আধুনিক ও আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন স্থানীয়দের কর্মসংস্থান ও সরকারের রাজস্ব বাড়বে, অন্যদিকে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরাও নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে সময় কাটাতে পারবেন।

গত শুক্রবার ছুটির দিন বিকালে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে পদ্মা নদীর তীরে গিয়ে দেখা যায় হাজারো মানুষের সমাগম। কেউ এসেছেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, আবার কেউ এসেছেন বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে দলবেঁধে।

বন্ধুদের সাথে বেড়াতে আসা শাকিল হোসেন নামের এক যুবক জানান, বর্তমান সময়ে এই জায়গাটি বেড়ানোর জন্য অত্যন্ত চমৎকার একটি স্থানে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ছুটির দিনে তারা বন্ধুরা মিলে এখানে ঘুরতে আসেন, ছবি তোলেন এবং সময়টা তাদের খুব ভালো কাটে।

আরও পড়ুন

খাইরুল ইসলাম নামের আরেক দর্শনার্থী জানান, পাবনা জেলায় পরিবার নিয়ে বেড়ানোর মতো তেমন কোনো সুন্দর জায়গা নেই। সেই তুলনায় পাকশী এলাকাটি মন্দের ভালো। এখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে ওঠার পর থেকে সাধারণ মানুষের কাছে এই এলাকার আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। সেই টানেই তিনি মাঝেমধ্যে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে এখানে বেড়াতে আসেন।

আগত দর্শনার্থীদের আনন্দের পাশাপাশি এখানকার বেশ কিছু নাগরিক সংকট ও সমস্যার কথাও উঠে এসেছে। ভ্রমণে আসা সাধারণ মানুষ অভিযোগ করেন, হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচ দিয়ে পদ্মা নদীর পাড়ে নামার প্রধান সড়কটির অবস্থা অত্যন্ত বেহাল ও জরাজীর্ণ। এর পাশাপাশি সেখানে কোনো পাবলিক টয়লেট ও বসার জন্য কোনো ছাউনি নেই। একই সাথে এলাকাটিতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব রয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন। ভ্রমণপিপাসু মানুষ অনতিবিলম্বে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানান।

সরকারি দাপ্তরিক কাজে ঢাকা থেকে ঈশ্বরদীতে এসে ছুটির দিনে পাকশী ভ্রমণে বের হয়েছেন আশিক হাসান নামের এক চাকরিজীবী। তিনি বলেন, অফিশিয়াল কাজে ঈশ্বরদীতে আসার পর পাকশীর সৌন্দর্যের কথা শুনে এখানে ঘুরতে এসেছেন। এখানকার পরিবেশ ও চারপাশের দৃশ্য তার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। তিনি মনে করেন, সরকারের উদ্যোগে এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে তা সবার জন্য দারুণ হবে।

জিনিয়া খাতুন নামের এক গৃহবধূ এখানকার অব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, জায়গাটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সুন্দর। কিন্তু এখানে নাগরিক সুবিধার চরম ঘাটতি রয়েছে। পদ্মার পাড়ে নামার ভালো কোনো রাস্তা নেই, নারীদের জন্য কোনো পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা নেই। এর পাশাপাশি এখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই বলে তার মনে হয়েছে। এই মৌলিক সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করা অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

স্থানীয় একটি কলেজের প্রভাষক আরিফ আহমেদ এই এলাকার অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে বলেন, এই নির্দিষ্ট অঞ্চলটিকে কেন্দ্র করে একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার অপার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সরকার যদি এই স্থানটিকে নিয়ে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন করে, তবে সাধারণ মানুষ যেমন সুস্থ বিনোদনের সুবর্ণ সুযোগ পাবে, ঠিক তেমনি এখান থেকে সরকারও প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অর্জন করতে পারবে।

পাকশীকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার নানামুখী সম্ভাবনা ও স্থানীয়দের দাবির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব জানান পাবনার জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম। তবে তিনি বলেন, একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য যে বিশাল অঙ্কের বাজেটের প্রয়োজন হয়, তা স্থানীয় জেলা প্রশাসনের পক্ষে সংস্থান করা সম্ভব নয়।

অবশ্য এ বিষয়ে পাবনার সর্বস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি ওঠলে জেলা প্রশাসন বিষয়টি পর্যটন মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করবে বলে জানান জেলা প্রশাসক। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি সুপরিকল্পিত পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিকালের আলো ফুরিয়ে যখন সন্ধ্যা নেমে আসে, তখন ফেরার পথে দর্শনার্থীদের চোখে ধরা দেয় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এক ভিন্ন রূপ। রাতের অন্ধকারে আলো ঝলমলে চুল্লীগুলোর অপরূপ সৌন্দর্য চারপাশের পরিবেশকে এক মায়াবী রূপ দান করে। এই অপরূপ রূপপুর ও ঐতিহাসিক পাকশীকে ঘিরে সরকার দ্রুত একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ নেবে, এমনটাই এখন উত্তর জনপদের সর্বস্তরের মানুষের প্রত্যাশা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad