শেখ হাসিনার আমলে নিয়োগ পাওয়া মো. সাহাবুদ্দিন এখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসেরও রাষ্ট্রপতি। জুলাই-আগস্টের উত্তাল দিনগুলো, বিশেষ করে ৫ আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের সময় জাতীয় সংসদ, গণভবনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনা বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। প্রাণ বাঁচাতে শেখ হাসিনা যখন ভারতে পালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তার অতি প্রিয়ভাজন, বিশ্বস্ত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন সেনাবাহিনীর বিশেষ প্রহরায় অবস্থান করছিলেন বঙ্গভবনে। তিনি স্বপদে রয়েছেন। নতুন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়ালেন। তারপর চলে গেলেন লোকচক্ষুর আড়ালে।
সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি নেই। আচার্য হিসেবে দায় থাকলেও যান না কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে। চিকিৎসার জন্যও যেতে পারেন না বিদেশে। গণমাধ্যমেও তার উপস্থিতি নেই। মুজিবভক্ত, হাসিনা অনুরাগী এ রাষ্ট্রপতির ভাগ্যে কী অপেক্ষা করছে–এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সামাজিকমাধ্যমে। বঙ্গভবনের চার দেয়ালে শুধুমাত্র পরিবারের গুটিকয়েক সদস্য সঙ্গে নিয়ে কার্যত তিনি কাটাচ্ছেন বন্দিজীবন।
টাইমস অব বাংলাদেশের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে রাষ্ট্রপতির বর্তমান দিনযাপনের চিত্র।
২ অক্টোবর বৃহস্পতিবারের রোদ ঝলমলে সকালে বঙ্গভবনে গিয়ে দেখা যায়, সতর্ক পাহারায় রয়েছে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট। সারি সারি ট্যাংক ও আর্মার্ড পার্সোনাল (এপিসি) তাক করা মূল সড়কের দিকে। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সতর্ক চোখ চারদিকে। দিনটি ছিল অন্যদিনের চেয়ে আলাদা। বহুদিন পর রাষ্ট্রপতি প্রকাশ্যে আসবেন। বঙ্গভবনের দরবার হলে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে। বেলা ১১টা থেকে শুরু হয় অভ্যর্থনা, চলে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত। লাল রংয়ের পাঞ্জাবি আর পায়জামা পরিহিত রাষ্ট্রপতি সনাতন সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। এ সময় সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী রেবেকা সুলতানা, ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বিধান চন্দ্র রায় পোদ্দার, স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি, সনাতন ধর্মীয় নেতা এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা।

টাইমসের পক্ষ থেকে তাকে বিজয়ার অভিবাদন জানিয়ে প্রশ্ন করা হয়, আপনি বাইরে যান না? প্রশ্ন শুনে বিব্রত সাহাবুদ্দিন বললেন, ‘আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন।’ পাশে দাঁড়ানো ধর্ম উপদেষ্টা কিছু বললেন না। শুধু মুচকি হাসলেন।
এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা অনুষ্ঠান আর খাওয়া-দাওয়া শেষে অতিথিদের বিদায় জানিয়ে সিঁড়ি বেয়ে তিনি চলে গেলেন তার বিশ্রাম কক্ষের দিকে। অন্য অতিথিদের সঙ্গে বেরিয়ে আসার মুহূর্তে চোখ যায় বঙ্গভবনের সদর দরজার ওপরে। সেখানে ঝুলছে শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার ছবি। অন্য দেওয়ালগুলোতে দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিশিষ্টজনদের ছবি। কিন্তু কোথাও বর্তমান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ছবি নেই!
গত ১৫ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো থেকে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ছবি নামিয়ে ফেলার নির্দেশনা দিয়ে ফোন করা হয়। এ ঘটনায় কূটনৈতিক মহলে জন্ম হয় কৌতূহলের। তাহলে কি সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে? কী ঘটছে রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে?
দীর্ঘ এক মাস নীরবতা ভেঙে তিনি নিজেই সরব হন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর বঙ্গভবনের অফিশিয়াল প্যাডে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনকে লেখা চিঠির শেষে সাহাবুদ্দিন লেখেন, ‘আমার কোনো অনুযোগ নেই। তবে আছে বুকভরা আর্তনাদ।’

চিঠিতে তিনি প্রশ্ন তুলে আরও লেখেন, ‘রাষ্ট্রপতির আসনে এবং দায়িত্বপালনরত দেশের রাষ্ট্রপতি যেন অপদস্থ না হয়, সে জন্য কি কৌশলী পদক্ষেপ নেওয়া যেত না? জি, বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের কূটনৈতিক অফিস থেকে আমার ছবি অপসারণের ঘটনার কথা উল্লেখ করছি।’
‘আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করছি,’–এ কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘একরাতের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলকভাবে আমার ছবিটি অপসারণ করে শুধু গণমাধ্যমের উপজীব্য নয় বরং সামাজিক যোগাযোগেরমাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আমার সম্মান ভূলুণ্ঠিত হলো। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হলো অপমানিত।’
রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব সাগর হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, চিঠিটি ২৮ সেপ্টেম্বর সই করা হয়েছিল। পরে তা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ডেসপ্যাচ রাইডারের’ মাধ্যমে পাঠানো হয়।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তাও এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
বঙ্গভবনের একাধিক সূত্র বলছে, বঙ্গভবনের চার দেওয়ালে কড়া নিরাপত্তায় কাটছে রাষ্ট্রপতির দিনকাল। যেখানে খুশি সেখানে যাওয়ার অনুমতি নেই। যখন যাকে খুশি ডেকে গল্প করবেন–নেই সে সুযোগও। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তন অনুষ্ঠান–যেখানে তার উপস্থিতি অবধারিত ছিল, সেখানেও তার ডাক আসে না। পছন্দের সাংবাদিকদের ডেকে প্রাণ খুলে দুকথা বলবেন সে উপায়ও নেই। নেই তার প্রেস উইং।
গত কয়েকমাসে সরকারি বার্তা সংস্থা রাষ্ট্রপতির কর্মকাণ্ডের কোনো খবরও প্রচার করেনি। প্রেস উইং বলে যে বিভাগের সঙ্গে সংবাদকর্মীরা যোগাযোগ রাখতেন, সেটিও কার্যকর নেই। ওয়েবসাইট আছে, কিন্তু এটি আপডেট করার টেকনিক্যাল কর্মচারী সেখানে নেই।

বঙ্গভবনের বিশাল আঙিনা যেন রাষ্ট্রপতির স্পর্শ না পেয়ে মিইয়ে গেছে। ঝাড়বাতির আলোর ঝলকানিও উপভোগ করেন না তিনি। সুইমিং পুলের পানি নিয়মিত বদল হলেও সেখানে গোসল করার কেউ নেই। সাধারণত রাষ্ট্রপতি জাতীয় ঈদগাহে আদায় করেন ঈদের নামাজ। কিন্তু এ বছর সাহাবুদ্দীন ঈদেও যাননি সেখানে।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির দেখা হয় না খুব একটা। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, এ পর্যন্ত সর্বমোট ছয়বার দুইজনের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হয়েছে। বিশেষ দিবসেও তারা ভিন্নভিন্ন সময়ে শহীদদের ফুল দেন। ফলে তাদের কথাবার্তাও তেমন একটা হয় না বললেই চলে।
ছুটি নিয়ে বাইরে যাবেন, সে উপায়ও নেই। নেই পদত্যাগ করার সুযোগ। পদত্যাগ করলেই সাংবিধানিক শূন্যতা দেখা দেবে।
গত বছরের ১৯ অক্টোবর শেখ হাসিনার কথা ইঙ্গিত করে রাষ্ট্রপতি দৈনিক মানবজমিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘উনি তো আমাকে কিছু বলে যাননি। তার কোনো পদত্যাগপত্র আমাকে দেননি।’
রাষ্ট্রপতির এমন মন্তব্যে সরকারের মধ্যে শুরু হয় তোলপাড়। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তাকে ‘মিথ্যাবাদী ও শপথ ভঙ্গকারী’ আখ্যা দেন। রাষ্ট্রপতি পদে সাহাবুদ্দিনের থাকার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আসিফ নজরুল।
সাহাবুদ্দিন সবশেষ ঢাকার বাইরে নিজ জন্মস্থান পাবনায় গিয়েছিলেন হাসিনা সরকারের আমলে, ২০২৩ সলের শুরুর দিকে। দুদিনের সফরে সস্ত্রীক সেখানে অবস্থান করে নৌকা বাইচসহ নানা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এরপর ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে চিকিৎসার জন্য যান সিঙ্গাপুর। সেটিই ছিল তার সবশেষ বিদেশ সফর।
এরপর আসে ২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতি। রাষ্ট্রপতির অন্য এক জীবন! যেন নিরাপত্তার কঠোর জালে অদৃশ্য এক কারাগারে আটকে পড়া বন্দী এক মানুষ!
৫ আগস্ট থেকেই বঙ্গভবনকে বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ে নিয়ে আসে সেনাবাহিনীর প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের সদস্যরা। সেদিন রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বঙ্গভবনে মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে হাজির হয়েছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৮ আগস্ট রাষ্ট্রপতি বিনাবাক্যে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ পড়ান। পরেও একাধিক শপথ অনুষ্ঠান করেছেন পরিচালনা। মুহাম্মদ ইউনূস যেভাবে চেয়েছেন, সে পথেই হেঁটেছেন তিনি। তবুও ইউনূস ও তার উপদেষ্টাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পারছেন না রাষ্ট্রের এই সর্বোচ্চ ব্যক্তি। আদর্শিক দূরত্ব তাদের মধ্যে তৈরি করেছে বিশাল এক দেয়াল।

৭০-এর দশকে ছাত্রলীগ করা সাহাবুদ্দিন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট স্বপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে গ্রেপ্তার হয়ে করেছেন কারাভোগ। শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত সাহাবুদ্দিনকে বিশ্বাস করতে নারাজ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। সামাজিকমাধ্যমে পোস্ট দিয়ে সারজিস-হাসনাতরা রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবি করেছেন। বঙ্গভবনের সামনে তারা বিক্ষোভও করেছেন।
রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাহিনীর এক কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে বঙ্গভবন এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সাক্ষাৎ প্রার্থীর সংখ্যাও করা হয়েছে সীমিত।
কখন রাষ্ট্রপতি ঘুম থেকে উঠবেন, ওজু করবেন আর নামাজ পড়বেন; কখন কাকে ফোন করবেন, কোন কোন ফাইলে সই করবেন–সব আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। নিয়মিত অর্ডিন্যান্সে সই করেন তিনি। চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তাকে নেওয়া হয় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ)।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল জোনের ডিসি মো. শাহরিয়ার আলী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) পাশাপাশি সেনাবাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ন বঙ্গভবনে নিরাপত্তার বিশেষ দায়িত্ব পালন করছে। পাশাপাশি পুলিশও পালন করছে নিরাপত্তার দায়িত্ব। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনো নিরাপত্তা নেওয়া হয়নি।’
সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল ২২তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তাকে শপথ পড়ান সে সময়ের স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরী। শেখ হাসিনার এ মনোনয়নে অনেকেই সেদিন বিস্মিত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ আপত্তিও তুলেছিলেন। কিন্তু সে সব আপত্তিকে গুরুত্ব দেননি হাসিনা। সাহাবুদ্দিন ছিলেন শেখ হাসিনার একান্ত অনুগত, বিশ্বস্ত। দেখা হলে শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে সালাম করতেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার আগে সাহাবুদ্দিন ছিলেন দুনীর্তি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার। সে সময় পদ্মা সেতু বিষয়ক দুনীর্তির তদন্তও করেছিলেন। ‘পদ্মা সেতুতে কোনো দুর্নীতি হয়নি’ বলে মন্তব্য করে মুহাম্মদ ইউনূসের নাম উল্লেখ না করেই তিনি ‘এর পেছনে এক ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের’ তথ্যও দিয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ ও ব্যক্তিগত একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, ‘স্যারের মনটা ইদানিং খুবই খারাপ থাকে। স্ত্রী আর একমাত্র পুত্রের সঙ্গে গল্পগুজব করে সময় কাটান। মুখে হাসি না থাকলেও নিয়ম মেনে কাজ করেন। মাঝে মাঝে বাগানে পায়চারি করেন। গান শোনেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রায়ই কী যেন ভাবেন।’


