রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্যারিস রোডসংলগ্ন এলাকায় ‘নবোকালচার’ নামে একটি সংগঠনের উদ্যোগে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ছবি সম্বলিত একটি বিলবোর্ড টাঙানোকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সংগঠনটির পরিচালক হিসেবে রয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মার।
শনিবার ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ নামে বিলবোর্ডটি টাঙানো হয়। এতে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মীর কাসেম আলী, মতিউর রহমান নিজামী, আব্দুল কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি দেখানো হয়েছে। বিলবোর্ডটি টাঙানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
বিষয়টি নিয়ে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও নবোকালচারের পরিচালক সালাউদ্দিন আম্মার টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, নবোকালচারের বিলবোর্ডে যাদের ছবি ছিল, তাদের কয়েকজনকে বাংলাদেশের আদালত যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত করেছেন। এ নিয়ে এর আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্ক হয়েছে। তবে আমাদের বিলবোর্ডের মূল বিষয় ছিল ‘জুডিশিয়াল কিলিং’। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রভাবে পরিচালিত বিচার ও মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নটি তুলে ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, খুন, আয়নাঘর, শাপলা হত্যাকাণ্ড এবং বিচারব্যবস্থা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটেই বিলবোর্ডটি তৈরি করা হয়েছে। সেখানে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ কয়েকজনের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। উদ্দেশ্য কাউকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া নয়; বরং তাদের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ছিল কি না, সেই বিতর্কটি সামনে আনা।
তিনি আরও বলেন, এ নিয়ে দেশে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ তাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দেখেন, আবার কেউ বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ মনে করেন। বিচার চলাকালে সাক্ষী সুকরঞ্জন বালীর নিখোঁজ হওয়া, স্কাইপ কথোপকথন ফাঁসসহ বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা হয়েছে। সেই কারণেই ‘জুডিশিয়াল কিলিং’ প্রসঙ্গটি বিলবোর্ডে স্থান পেয়েছে।
এই বিষয়ে রাকসুর সহ-সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার সাথে কর্তৃপক্ষ কোনো যোগাযোগ করেনি। তারা কোন সেন্সে এটা করেছে সেটা তারা জানে। তবে আমার মনে হয় এটা বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তুলে ধরেছে। তবে এখানে রাকসুর ফান্ড কিংবা রাকসু জড়িত নয়।’
গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, রাকসু হোক বা নবোকালচার—যে-ই এ ধরনের উদ্যোগ নিক না কেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কিংবা বাংলাদেশের কোথাও রাজাকারদের কোনো ধরনের স্বাভাবিকীকরণ আমরা মেনে নেব না। যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নটি বাংলাদেশের মৌলিক জাতীয় ইস্যু। ২০২৪ সালের আন্দোলন কিংবা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদবিরোধী অবস্থানকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধী মতাদর্শ বা তাদের পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ নেই।’
তিনি আরও বলেন, আমাদের অভিযোগ, ২০২৪-কে আশ্রয় করে জামায়াত-শিবির তাদের রাজনীতি ও আদর্শকে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, এবং আমরা তার বিরোধিতা করছি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি দাবি জানিয়ে ফুয়াদ রাতুল বলেন, বিতর্কিত বিলবোর্ডটি দ্রুত অপসারণ করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু বলেন, ‘দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন, প্রচারপত্র বিতরণ এবং দলীয় কর্মসূচি পরিচালনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে এটি আমাদের কাছে অত্যন্ত দুঃখজনক। জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে অতীতের অপ্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক ইস্যু জুড়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা আমরা দেখি না। এটি কেবল রাজনৈতিক বিভাজন ও উত্তেজনা সৃষ্টি করার একটি অপচেষ্টা বলে মনে করি। যুদ্ধাপরাধের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়কে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপনেরও চেষ্টা করা হচ্ছে।
শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী হাসান মারুফ বলেন, ১৯৭১ সালে আল-বদর ও রাজাকার বাহিনীর চিহ্নিত সদস্যদের আমরা ঘৃণাভরে স্মরণ করি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে যুদ্ধাপরাধের মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তিদের ছবি প্রদর্শন বা তাদের ঘিরে বিতর্কিত ন্যারেটিভ তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, নবকালচারের প্রতিষ্ঠাতা রাকসুর সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় এখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নও উঠেছে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই, বিষয়টি তদন্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য (প্রশাসন) মো. আব্দুল আলিম বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা এখনো অবগত নই। আমরা বিষয়টি খোঁজ নিচ্ছি।’


