বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, গত বছরের ৪ আগস্ট থেকে এ বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর কমপক্ষে ২৪৪২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু অপরাধীদের কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। আর সংখ্যালঘু নিপীড়নের ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসাজনিত’ সহিংসতা বলে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন ঐক্য পরিষদের নেতারা।
নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, ‘সম্প্রতি যশোরের অভয়নগরের ডহর মশিহাটি গ্রামের ২০টি হিন্দু পরিবারের বাড়িঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। কুমিল্লার মুরাদনগরে ধর্ষণের পর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ঢাকার খিলক্ষেতে বিনা নোটিশে বুলডোজার দিয়ে মন্দির গুড়িয়ে দেওয়া, লালমনিরহাটে পিতা-পুত্রকে কথিত ধর্মঅবমাননার মিথ্যা অভিযোগে গণপিটুনি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে মব সৃষ্টি করে সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষককে হেনস্থা করে পদোন্নতি রুখে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে এবং এসব চলমান আছে।’
সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ বলেন, ‘রাজনৈতিক তকমা দিয়ে অপরাধ উস্কে দেওয়া হচ্ছে। এসব ঘটনার প্রতিকারে সরকারকে আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।’
‘যে কোনো দল মত আদর্শ চর্চার অধিকার সবার আছে। তার মানে এই নয় যে আপনি এজন্য নির্যাতন করবেন। অথচ তার বিচারও হবে না।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিও বলেন, ‘অনেক সংস্কার কমিশন হয়েছে। কিন্তু সংখ্যালঘুদের জন্য কোনো কমিশন হয়নি। এমনকি সংবিধান সংশোধন কমিটি থেকে শুরু করে অন্যান্য কমিশনের সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি নেওয়া হয়নি। দেশের ১০ শতাংশের অধিক ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্র সংস্কারের অংশীদার করা হয়নি।’
ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু নিপীড়নে জড়িত দুর্বৃত্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান সংগঠনটির আরেকজন সভাপতি নিম চন্দ্র ভৌমিক।
তিনি বলেন, ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে হলে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার চর্চা করতে হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগের দিন থেকে এ বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সংখ্যালঘু নিপীড়নের তথ্য উপাত্ত তুলে ধরা হয়।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তথ্য অনুসারে, দেশের বিভিন্ন স্থানে ৩৩০ দিনে সংখ্যালঘুদের ওপর ২৪৪২টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে হত্যার শিকার হয়েছেন ৫০ জন ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২৯ জন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, গত বছরের ৪ আগস্ট থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ১০টি। এরপর ২১ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সহিংসতার ঘটনা ঘটে ১৭৪টি। এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ২৫৮টি।
শুধু এ বছরের ছয় মাসে হত্যার শিকার হয়েছেন ২৭ জন, ধর্ষণের শিকার ২০ জন, উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে ৫৯টি। কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ২১টি, জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে ৪ জনকে, বাড়িঘরে ভাঙচুর লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে ৮৭টি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল হয়েছে ১২টি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং কমিউনিটি ভিত্তিক সোর্স থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজল দেবনাথ, জে এল ভৌমিক, সাংগঠনিক সম্পাদক দিপঙ্কর ঘোষ প্রমুখ।


