রমনা বটমূলে বাংলা নববর্ষের উৎসবে বোমা হামলার ২৫ বছর পার হয়ে গেলেও এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার আজও মীমাংসা হয়নি। দশজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া এবং বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান লণ্ডভণ্ড করে দেওয়ার সেই নৃশংস ঘটনার বিচার আজও দীর্ঘ শুনানি আর আইনি প্রক্রিয়ার জালে আটকে আছে।
২০০১ সালে পহেলা বৈশাখের সেই উৎসব মুহূর্তেই একটি রক্তক্ষয়ী ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছিল। ওই হামলায় ঘটনাস্থলেই নয়জন মারা যান। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার বিচার এক দশকেরও বেশি সময় আগে শেষ হলেও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের সমান্তরাল মামলাটি এখনো রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে।
মামলাটির বিচার কার্যক্রম বর্তমানে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের জবানবন্দি গ্রহণ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যায়ে থমকে আছে। আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২১ মার্চ এই বিস্ফোরক মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ পর্ব শেষ হয়েছে। এরপর মামলাটি কয়েকবার বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের পর বর্তমানে ঢাকার ১৫ নম্বর বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচারধীন আছে।
বিগত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে মামলাটি একই আইনি পর্যায়ে স্থবির হয়ে পড়ে রয়েছে। গত ৩১ মার্চ মামলার সর্বশেষ শুনানির দিনে বেশ কয়েকজন আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে উপস্থিত করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে বিচারক তৌহিদা আক্তার মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে আগামী ৯ জুলাই পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটিতে কোনো গতি ছিল না। বিগত সরকারের আমলে এই মামলার কার্যক্রমে খুব সামান্যই অগ্রগতি হয়েছিল। তবে মামলাটি এখন প্রায় শেষের পথে রয়েছে জানিয়ে তিনি আগামী পহেলা বৈশাখের আগেই এই মামলার একটি চূড়ান্ত সমাধান পাওয়ার আশা রাখছেন।
ফারুকী জানান, তালিকায় থাকা ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫৪ জন ইতিমধ্যে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। মামলার এই দীর্ঘ বিলম্বের পেছনে উচ্চ আদালতে চলমান বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের হাজির করার জটিলতা বড় ভূমিকা রেখেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই পরিস্থিতি মামলাটিকে অনেকটা পিছিয়ে দিয়েছে।
অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মাহফুজ হাসান বিচার বিলম্বের কারণ হিসেবে আসামিদের আদালতে হাজির করার সমস্যার কথা জানান। তিনি বলেন, বন্দি আসামিরা দেশের বিভিন্ন কারাগারে ভিন্ন ভিন্ন মামলায় আটক থাকায় তাদের সবাইকে একই দিনে আদালতে আনা প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যাতে দ্রুত ন্যায়বিচার পায় সেই লক্ষ্যেই তারা কাজ করে যাচ্ছেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. জসিম উদ্দিন আদালতে দাবি করেন, যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই অনেক আসামিকে প্রায় দুই দশক ধরে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, মূল এজাহারে তাদের নাম ছিল না। পরবর্তীতে কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ ছাড়াই শুধু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে তাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এভাবে দীর্ঘ সময় বন্দি রাখা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী বলে তিনি মন্তব্য করেন।
২০১৪ সালের জুন মাসে একটি বিশেষ আদালত এই হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করে। ঘটনার প্রায় ১৩ বছর পর দেওয়া সেই রায়ে আটজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ছয়জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে একই ঘটনার বিস্ফোরক মামলাটি আজও আলোর মুখ দেখেনি।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের সকালে রমনা বটমূলে নববর্ষ উদযাপনরত মানুষের ভিড় লক্ষ্য করে এই বোমা হামলা চালানো হয়। হামলার সেই দিনেই পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে অপর একটি মামলা দায়ের করে।
তদন্তকারীরা এই ঘটনার প্রায় আট বছর পর ১৪ জন আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। বারবার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হওয়া এবং সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলে দেরি হওয়া বিচার বিলম্বের অন্যতম কারণ। এছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের সময়মতো আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসাও এই দীর্ঘসূত্রতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
সিকি শতাব্দী পার হয়ে গেলেও বিস্ফোরক মামলার এই অমীমাংসিত অবস্থা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত হামলার বিচারে দীর্ঘ ছায়া ফেলছে। বিচারহীনতার এই গ্লানি নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আজও তাদের প্রিয়জন হারানোর চূড়ান্ত আইনি সমাপ্তির জন্য অপেক্ষায় দিন গুনছে।


