গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশকে কেন্দ্র করে সহিংসতার সময় মাটিতে পড়ে থাকা এক তরুণকে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও ভাইরাল হয় সমাজ মাধ্যমে। এরপর জনমনে দেখা দেয় প্রশ্ন— কে এই তরুণ? কীভাবে তিনি আহত বা নিহত হন? কী তার অপরাধ?
টাইমস অব বাংলাদেশের সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই তরুণের নাম রমজান কাজী (১৭), পেশায় টাইলস মিস্ত্রির সহকারী। ১৬ জুলাই সংঘর্ষ চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন রমজান।
গোপালগঞ্জ শহরের আলিয়া মাদ্রাসার কাছে বঙ্গবন্ধু সড়কে তার রক্তের দাগ এখনও দৃশ্যমান। এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ‘বিকেল চারটার দিকে আমরা তাকে টেনে নিয়ে যেতে দেখি, কিন্তু ভয়ে পালিয়ে যাওয়ায় কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়, তা জানি না।’

পরে তার মরদেহ পাওয়া যায় লঞ্চঘাটের কাছে। সেখান থেকে পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন।
রমজানের বাবা কামরুল কাজী টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, ছেলের শরীরে চার-পাঁচটি গুলির চিহ্ন দেখেছেন তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষের দিন বিকেলে রমজান ও তার বন্ধুরা মাদ্রাসার পাশে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখছিলেন। সমাবেশ শেষের দিকে আওয়ামী লীগ, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর সেনাবাহিনীও ঘটনাস্থলে আসে।
সংঘর্ষের এক পর্যায়ে কয়েকজন নিরাপত্তা সদস্য রমজানকে টেনে নেয়, তবে তাকে কোথায় নেওয়া হয়েছিল বা কে গুলি করেছিল তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বিকেল সাড়ে চারটার দিকে টাইমস অব বাংলাদেশের ক্যামেরায় ধরা পড়ে, রমজানের মামা কলিম মুন্সী রিকশাভ্যানে তার রক্তাক্ত দেহ সদর হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। আহাজারি করতে করতে ভ্যানের পেছনে ছুটছেন বাবা কামরুল ও মা মর্জিনা। রক্তাক্ত রমজানের গলায় গুলির চিহ্ন দেখা গেছে।
এছাড়া ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া ভিডিও দেখে রমজানের পরিচয় নিশ্চিত করেন বাবা, মা ও মামা।
রমজানের বাবা জানান, ‘কেউ খবর দেয় লঞ্চঘাটে একটা লাশ পড়ে আছে— হয়তো আমার ছেলেই। গিয়ে দেখি, রক্তের মধ্যে পড়ে আছে রমজান।’
রমজানকে রিকশা ভ্যানে করে তার স্বজনরা আড়াইশ শয্যার জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
তবে পরিবারের অনুরোধ সত্ত্বেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ময়নাতদন্ত না করে দাফনের নির্দেশ দেয়।
রমজানসহ নিহত চারজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফন ও সৎকার করা হয়, যা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

আত্মীয়স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চারজনের কারও ক্ষেত্রেই সুরতহাল ও প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন করেনি পুলিশ।
রমজানের মামা কলিম বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে বলা হলো— ময়নাতদন্ত হবে না, লাশ নিয়ে যান। থানায় গেলেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়।’
নিহতদের মধ্যে ছিলেন উদয়ন রোডের পোশাক ব্যবসায়ী দীপ্ত সাহা (৩০), সেদিন রাতেই দাহ করা হয়। কোটালীপাড়ার হরিণহাটিতে রমজান কাজীকে জানাজা শেষে দাফন করা হয়।
পরদিন সানাপাড়ার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী সোহেল রানা (৩৫) ও ভেরার বাজারের কাঁচামালের দোকান কর্মচারী ইমান তালুকদার (২৪)– এই দুজনকেও দাফন করা হয়।
নিহতদের পরিবার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, তাদের শরীরে গুলির চিহ্ন ছিল। টাইমস অব বাংলাদেশ প্রতিনিধি হাসপাতাল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. জেবতীশ বিশ্বাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি। সরাসরি দেখা করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পুলিশ ময়নাতদন্ত ছাড়াই দাফনের নির্দেশ দিয়েছিল বলে অভিযোগ উঠলেও, বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়েছে— পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘উত্তেজিত জনতা মরদেহ নিয়ে নেওয়ায়’ ময়নাতদন্ত সম্ভব হয়নি।


