১৯৬০ সালের ১৬ জুন। সাদাকালো পর্দায় মুক্তি পেয়েছিল একটি চলচ্চিত্র, যা শুধু দর্শকদের ভয় পাইয়ে দেয়নি, বদলে দিয়েছিল বিশ্ব সিনেমার গল্প বলার ধরন। সেই চলচ্চিত্রের নাম ‘সাইকো’)। আর এর নির্মাতা ছিলেন কিংবদন্তি আলফ্রেড হিচকক ।
মুক্তির ৬৬ বছর পরও ‘সাইকো’ শুধু একটি হরর চলচ্চিত্র নয়; এটি চলচ্চিত্র ইতিহাসের এমন এক মাইলফলক, যার প্রভাব আজও বিশ্বজুড়ে নির্মিত থ্রিলার, সাসপেন্স ও হরর সিনেমায় স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
‘সাইকো’র আগে হরর সিনেমা মানেই ছিল ভূত, দানব, ভিনগ্রহের প্রাণী কিংবা অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তির গল্প। কিন্তু হিচকক দেখালেন, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয়টি হয়তো মানুষের মনোজগতের গভীরেই লুকিয়ে থাকে।
ছবিটির কেন্দ্রীয় চরিত্র নরম্যান বেটস—একজন সাধারণ মোটেল মালিক। প্রথম দেখায় তিনি শান্ত, ভদ্র ও নিরীহ। কিন্তু গল্প যত এগোয়, দর্শক ততই আবিষ্কার করতে থাকে তার অন্ধকার মানসিক জগত। এই চরিত্রের মাধ্যমে ভয়কে অতিপ্রাকৃত জগত থেকে টেনে আনা হয় বাস্তব জীবনের ভেতরে। আজকের অধিকাংশ মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের ভিত্তি অনেকটাই তৈরি হয়েছিল ‘সাইকো’র হাত ধরে।
চলচ্চিত্র ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যগুলোর একটি হলো এ ছবির ‘শাওয়ার সিন’। মাত্র কয়েক মিনিটের এই দৃশ্য বিশ্ব সিনেমায় সম্পাদনা, ক্যামেরার ব্যবহার এবং সাউন্ড ডিজাইনের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মজার বিষয় হলো, দৃশ্যটিতে ছুরির আঘাত সরাসরি দেখানো হয়নি। দ্রুত কাট, নিখুঁত ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল এবং তীক্ষ্ণ সঙ্গীতের ব্যবহারে এমন এক আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল, যা দর্শকদের মনে গভীর ছাপ ফেলে। আজও এই দৃশ্য বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র বিদ্যালয়ে পাঠ্য হিসেবে আলোচিত হয়।
শুধু গল্পে নয়, নির্মাণ কৌশলেও বিপ্লবী ছিল ‘সাইকো’। হলিউডের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্রকে গল্পের শুরুতেই সরিয়ে দেওয়া প্রায় অকল্পনীয় ছিল। কিন্তু হিচকক সেই ঝুঁকিই নিয়েছিলেন।
দর্শক যখন মনে করেছিল গল্পটি একটি নির্দিষ্ট পথে এগোবে, তখন হঠাৎ করেই পুরো কাহিনির কেন্দ্রবিন্দু বদলে যায়। এই অপ্রত্যাশিত মোড় পরবর্তী সময়ে অসংখ্য থ্রিলার ও রহস্যচিত্রের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে।
হিচকক সে সময় বড় বাজেটের রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু ‘সাইকো’ নির্মিত হয়েছিল তুলনামূলক কম বাজেটে এবং সাদাকালো ফরম্যাটে। স্টুডিওর অনেকেই ছবিটি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। কেউ কেউ মনে করেছিলেন, এটি অত্যন্ত বিতর্কিত একটি চলচ্চিত্র হতে যাচ্ছে।
কিন্তু মুক্তির পর সব ধারণা পাল্টে যায়। ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে বিশাল সাফল্য অর্জন করে এবং সমালোচকদেরও ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। পরবর্তীকালে এটি বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
পরবর্তী কয়েক দশকে নির্মিত অসংখ্য চলচ্চিত্রে ‘সাইকো’র প্রভাব দেখা গেছে। আধুনিক স্ল্যাশার ঘরানার পথিকৃৎ হিসেবেও ছবিটিকে বিবেচনা করা হয়। নরম্যান বেটস চরিত্রটিও চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ভিলেনে পরিণত হয়েছে।
হ্যালোউইন, ফ্রাইডে দ্য থার্টিনথ, দ্য সাইলেন্স অব দ্য ল্যাম্বস কিংবা সাম্প্রতিক বহু মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের ভেতরেও ‘সাইকো’র ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়।
বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে অনেক হরর চলচ্চিত্র এসেছে, আবার হারিয়েও গেছে। কিন্তু সাইকো সময়কে অতিক্রম করে একটি সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ৬৬ বছর পরও চলচ্চিত্রটি মনে করিয়ে দেয়—সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অন্ধকার কখনো কখনো মানুষের নিজের ভেতরেই বাস করে।


