যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল কাঙ্ক্ষিত শান্তি আলোচনার জন্য প্রস্তুত পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ। এরইমধ্যে গোটা শহর ঢেকে ফেলা হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে। ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে স্কুল, কলেজ, সরকারি দপ্তরে। গোটা বিশ্বের নজর আটকে আছে ইসলামাবাদে। অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকটি ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা ও উদ্বেগের মিশ্র আবহ। মধ্যপ্রাচ্যে কি তবে স্থায়ী শান্তি ফিরছে?
প্রায় ছয় সপ্তাহ আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আকস্মিকভাবে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ওই হামলায় পরিবারের প্রায় পাঁচ সদস্যসহ নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ওই হামলার পরই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বাইরেও ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ যুদ্ধে যোগ দিলে ফের যুদ্ধে জড়ায় ইসরায়েল-লেবানন। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ইরান হামলা চাললে কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে জড়ায় সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাকসহ একাধিক দেশ।
যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের চাপে ফেলতে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয় ইরান। মুহূর্তেই অস্থির হয়ে ওঠে বিশ্ব তেলের বাজার। রেকর্ড দাম এবং জ্বালানি সংকটে মজুত রাখা তেল বাজারে ছাড়তে বাধ্য হয় অনেকে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ক্রমবর্ধমান প্রাণহানি বন্ধে এবং বিশ্ব তেল বাজারে স্বস্তি ফেরাতে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে বসতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে চাপ দিতে থাকেন বিশ্ব নেতারা।
এতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যস্থতার ভার নেয় পাকিস্তান সরকার। দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের যোগাযোগ সহায়তায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। সেই প্রেক্ষাপটেই শনিবার ইসলামাবাদের মারগালায় শান্তি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
কবে, কোথায় বৈঠক
হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, শনিবার স্থানীয় সময় সকালে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ জানায়, আলোচনা সর্বোচ্চ ১৫ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। ফলে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ইসলামাবাদে অবস্থান করতে পারেন বা পরবর্তী দফার জন্য আবারও দেশে ফিরে আসতে পারেন।
ইসলামাবাদের সেরেনা হোটেলকে বৈঠকের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেছে পাকিস্তান সরকার। এ হোটেলেই আমন্ত্রিত অতিথিরা অবস্থান করবেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশেই অবস্থিত এই হোটেলটি বুধবার সন্ধ্যা থেকে রোববার পর্যন্ত খালি করে দেওয়া হয়েছে এবং এটিকেই আলোচনার মূল ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
পাশাপাশি রাজধানী ইসলামাবাদে ৯ ও ১০ এপ্রিল সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। পুলিশ, হাসপাতাল ও ইউটিলিটি সেবাসহ জরুরি খাতগুলো এই ছুটির বাইরে থাকবে। পুরো শহরে নিরাপত্তা জোরদারে মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত সেনা, রেড জোন ঘোষণা করে বন্ধ রাখা হয়েছে কূটনৈতিক পাড়ার প্রবেশপথগুলো।
কারা থাকছেন আলোচনার টেবিলে
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার।
আলোচনায় ট্রাম্পের বিশ্বস্তভাজন ভ্যান্সের অংশগ্রহণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, ইরান উইটকফ ও কুশনারের সঙ্গে আগের আলোচনায় আস্থা হারিয়েছে। সে সময় আলোচনা চলাকালেই তেহরানে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কাজেই ভ্যান্সকে তারা তুলনামূলকভাবে সংঘাত কমাতে আগ্রহী হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। এ বৈঠকে দেশটির ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড কর্পসের কোনো প্রতিনিধি থাকবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। অবশ্য গালিবাফ নিজেও ওই বাহিনীর সাবেক কমান্ডার।
তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরেও লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। তাদের দাবি, ওয়াশিংটন-তেহরান ঘোষিত যুদ্ধবিরতিতে বৈরুতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে শান্তি আলোচনায় অংশ নেওয়াকে ‘অযৌক্তিক’ মনে করছেন ইরানের কর্মকর্তারা।
এমনকি পাকিস্তানি কর্মকর্তারাও সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিনিধিদলগুলো ইসলামাবাদে না পৌঁছানো পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত নয়।
সম্প্রতি পাকিস্তানে ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সংক্ষিপ্ত এক বার্তায় জানিয়েছিলেন, ৯ এপ্রিল ইরানি প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছাবে।
তিনি বলেন, ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের কারণে ইরানি জনমতের মধ্যে সন্দেহ থাকলেও ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে গুরুত্বসহকারে আলোচনায় অংশ নেবে তেহরান। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি পোস্টটি মুছে দেন। এতে দুই পক্ষের আলোচনা সফলভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে শঙ্কা ও উদ্বেগ দেখা দেয়।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আলোচনার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন এবং শুক্রবার বা শনিবার ভোরে দুই পক্ষের সঙ্গে তিনি আলাদা বৈঠক করতে পারেন।
দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবেন। তবে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বৈঠকে অংশ নেবেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিরা আলাদা কক্ষে বসবেন এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারাই দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদানপ্রদান করবেন।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক ভিসা আবেদন করলেও অনুমোদন পেয়েছেন কেবল ২০ জন। এছাড়া ৩০ সদস্যের একটি মার্কিন নিরাপত্তা দল এরইমধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন।
মধ্যস্থতাকারী কেন পাকিস্তান
সাম্প্রতিক যুদ্ধে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে এসেছে ইসলামাবাদ। যুদ্ধ বন্ধে পাক সেনাপ্রধানই দুই দেশের নেতাদের মধ্যে বার্তা আদানপ্রদান করেছেন।
ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ৯০০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে এবং দেশটিতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া জনগোষ্ঠীর বসবাস। ফলে তেহরানের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব বেশি।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের মতো পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক ঘাঁটি না থাকায়ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছে তেহরান।
আবার ২০০৪ সাল থেকে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান অ-ন্যাটো মিত্র। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতা করায় ইসলামবাদ ওয়াশিংটনের আস্থাভাজন হয়ে উঠেছে।
কি আছে আলোচনার প্রস্তাবে
ইরানের ১০ দফা শান্তিচুক্তি প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ, ইরানসহ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো পুনর্গঠনে আর্থিক সহায়তার দাবি রয়েছে। এ ছাড়া ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের বৈধতা, ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জাতিসংঘে প্রস্তাব আকারে সব শর্তের অনুমোদন চেয়েছে তেহরান।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো শর্ত মেনে নেয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবটিকে আলোচনার জন্য কার্যকর বললেও, হোয়াইট হাউসের দাবি- ইরান তার পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধে রাজি হয়েছে এবং এটিই যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শর্ত।
তবে ইরানের দাবি, তারা কেবল পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি বাস্তবায়ন না করতে রাজি হয়েছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে বিরিত থাকার কোনো শর্তে তারা অনুমোদন দেয়নি।
লেবানন ইস্যু কেন বড় বিরোধ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়ে ইসরায়েলে হামলা থেকে সরে আসার ঘোষণা দেওয়ার পরও লেবাননে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। বুধবার ইসরায়েলের হামলায় দেশটিতে দুই শতাধিক বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেছেন, এই হামলা চলতে থাকলে ইরান যুদ্ধবিরতি থেকে সরে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা যুদ্ধবিরতি বজায় রাখবে, নাকি ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ চালাবে।’
অন্যদিকে ভ্যান্স বলেছেন, যুদ্ধবিরতির শর্তে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও একই বার্তা দিয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে সাবেক কূটনীতিক মাসুদ খালিদ বলেন, আলোচনার আগেই পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। ইসরায়েল আলোচনাকে ব্যাহত করতে লেবাননে হামলা বাড়াচ্ছে, যাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আরও কঠোর অবস্থান নেয়। তারা হয়তো কেবল সময়ক্ষেপণের জন্য এই যুদ্ধবিরতি দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে আগ্রহী মনে হচ্ছে না।
ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক সাহার খান বলেন, ‘স্থায়ী যুদ্ধ বন্ধে পারস্পরিক অবিশ্বাসই সবচেয়ে বড় বাধা। উভয় পক্ষই নিজেদের জয়ী দেখাতে এমন শর্ত দিয়েছেন যা প্রতিপক্ষের বাস্তবতায় মেনে নেওয়া দুষ্কর। এরপরও যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলে সেটিই হবে বড় অগ্রগতি।’
লেবানন মূল বিরোধের কেন্দ্র হওয়ায় মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান শান্তি আলোচনায় হিজবুল্লাহ নেতাদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে ইসরায়েল তা প্রত্যাখ্যান করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও লেবাননকে শান্তি আলোচনার বাইরে রেখেছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতার জন্য ইসরায়েলকেও আলোচনায় আনতে হবে, না হলে তারা শান্তি চুক্তি মানতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।
সাহার খান বলেন, ‘শান্তি চুক্তির গ্যারান্টি মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়। শান্তি নিশ্চিতে কোনো একক দেশের গ্যারান্টি দেওয়াও সম্ভব নয়। প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত আস্থা তৈরি করা। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধে বাধ্য করতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ নিশ্চিতভাবেই হাতছানি দিচ্ছে।’


