যশোরে রাসায়নিকের বিষে তৈরি হচ্ছে নকল দুধ

যশোরে রাসায়নিকের বিষে তৈরি হচ্ছে নকল দুধ
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

যশোরে সিলিকন জেল, কস্টিক সোডা, গরম পানি এবং চর্বি মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে গরুর নকল দুধ। এই নকল দুধ শিশুখাদ্য ও অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্য তৈরির জন্য ব্যবহার হচ্ছে। কোনো গরু ছাড়াই প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন অন্তত এক হাজার লিটার এই বিষাক্ত দুধ। আর এই নকল দুধ কিনে নিচ্ছে দেশের নাম করা বেশ কিছু বড় কোম্পানি। সোমবার র‍্যাবের এক অভিযানে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

কেশবপুর উপজেলার বৈরতি ঘোষপাড়া এলাকার অনেক মানুষের প্রধান জীবিকা গরুর দুধ বিক্রি করা। এই এলাকায় দুধের উৎপাদন বেশি হওয়ায় দেশের দুটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি সেখানে তাদের দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করে।

স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী গরুর দুধের আড়ালে নকল দুধ তৈরি করে কোম্পানির কাছে বিক্রি করছে। কোম্পানিগুলো জেনেশুনেই তা কিনছে বলে বেশ কিছুদিন ধরেই অভিযোগ শোনা যাচ্ছিল। র‍্যাব, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের যৌথ তদন্তে এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

অভিযানের সময় অপু ঘোষ নামে এক স্থানীয় ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। তিনি স্বীকার করেন,  ইউটিউব দেখে তিনি নকল দুধ তৈরির কৌশল শিখেছেন। অপু দুই বছর ধরে এই ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। তার ভাষ্যমতে, মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা খরচ করে এক কেজি জেল ব্যবহার করে ৯ থেকে ১০ লিটার নকল দুধ তৈরি করা সম্ভব। তিনি এই নকল দুধ ব্র্যাক, আড়ং, আকিজ এবং প্রাণের মতো বড় বড় কোম্পানিতে বিক্রি করেন। এসব দুধ তৈরির রাসায়নিক উপাদান তিনি যশোরের ভোলানাথ ও বিনিময় স্টোর থেকে সংগ্রহ করেন।

দেব ঘোষ নামে আরেক ব্যবসায়ী রাসায়নিক দিয়ে নকল দুধ তৈরির কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, এই এলাকার অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন নিয়মিতভাবে এই কাজের সঙ্গে জড়িত। তারা এই দুধ ব্র্যাকের সংগ্রহ কেন্দ্রে বিক্রি করেন।

দেব আরও জানান, রাসায়নিক উপায়ে তৈরি এই দুধ যাতে পরীক্ষায় আসল হিসেবে উত্তীর্ণ হয় তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা আছে। এই কৌশলের কারণে ভেজাল ও রাসায়নিক দুধ সহজেই পরীক্ষায় পার পেয়ে যাচ্ছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বড় কোম্পানিগুলো সঠিক পরীক্ষা ছাড়াই এই নকল দুধ কিনছে। এই অবৈধ কারবার চালিয়ে যাওয়ার পেছনে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কোম্পানিগুলোও সমান দায়ী বলে তারা মনে করেন।

আরও পড়ুন

স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজ কবির বলেন, কোম্পানিগুলো যদি দুধ সংগ্রহের সঠিক নিয়ম মেনে চলত তবে এই নকল দুধের কারবার চলত না। তিনি আরও জানান, পরীক্ষার পর ভেজাল দুধ যদি ফেরত দেওয়া হতো তবে ব্যবসায়ীরা এমন কাজ করার সাহস পেত না। তিনি জড়িত ব্যবসায়ী এবং কোম্পানি উভয়ের বিরুদ্ধেই কঠোর আইনি ব্যবস্থার দাবি জানান।

অভিযানের সময় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ব্র্যাকের দুধ সংগ্রহ কেন্দ্রের কেমিস্টের বিরুদ্ধে এই অবৈধ কাজে সহযোগিতার অভিযোগ তোলেন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ওই কেমিস্টের সনদ যাচাই করতে চাইলে মামুন নামের ওই ব্যক্তি কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। মামুন কখনো নিজেকে কেমিস্ট আবার কখনো ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে পরিচয় দেন।

এ বিষয়ে ব্র্যাক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ব্র্যাকের এরিয়া ম্যানেজার মামুনুর রশিদ জানান, সরাসরি দেখা করার পর তিনি এই বিষয়ে কথা বলবেন।

মামুনের কোনো সরকারি কেমিস্ট সনদ নেই বলে নিশ্চিত করেছেন কেশবপুরের নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক সুশান্ত দত্ত। তিনি জানান, মামুন শুধু ব্র্যাকের নিজস্ব কেন্দ্র থেকে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে অবৈধভাবে দুধের গুণমান পরীক্ষা করে আসছিলেন।

সুশান্ত দত্ত আরও বলেন, নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী লাইসেন্স দেওয়া হয়। কিন্তু মামুন কোনো প্রয়োজনীয় সনদ দেখাতে পারেননি। তিনি এই ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

ভেজাল দুধ তৈরির দায়ে দুই ব্যবসায়ীকে দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গোবিন্দ ঘোষের ডেইরি ফ্যাক্টরিকে ৫ হাজার টাকা এবং রাসায়নিক দিয়ে দুধ তৈরির অপরাধে অপু ঘোষকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেন, এই ভেজাল দুধ দীর্ঘ সময় পান করলে ক্যান্সারসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এই দুধ যারা কিনছে বা তৈরি করছে সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

র‍্যাব-৬ যশোরের কোম্পানি কমান্ডার মেজর ফজলে রাব্বি প্রিন্স জানান, বৈরতি ঘোষপাড়ায় নকল শিশুখাদ্য তৈরির গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা এই অভিযান পরিচালনা করেন। নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষের সাথে এই যৌথ অভিযানে নকল দুধ তৈরির সত্যতা মিলেছে। তিনি আশ্বাস দেন, র‍্যাবের এই ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

এর আগে গত ৯ মার্চ কেশবপুরের পাজিয়ায় র‍্যাব ভেজাল দুধ তৈরির একটি চক্রের ছয় সদস্যকে আটক করে। তারা গরুর দুধের সঙ্গে জেলাটিন, সয়াবিন তেল এবং সোডা মিশিয়ে ভেজাল দুধ তৈরি করত। সেই সময় তাদের জেল ও জরিমানা উভয় দণ্ডই দেওয়া হয়।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad