জুবায়ের তানিন, আবু ধাবি থেকে
আফগানিস্তানের বিপক্ষে এমন এক ম্যাচ, যেখানে আছে বিদেশ বিভূঁইয়ে প্রবাসী আর দেশে থাকা সমর্থকদের প্রত্যাশা, আছে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয়ার চাপও। এমন ম্যাচে বাংলাদেশের স্কোর বোর্ডে রান মাত্র ১৫৪,টুর্নামেন্টে টিকে থাকতে জেতার বিকল্প নেই, হারলে বাজবে বিদায় ঘণ্টা; তবুও একাদশে জেনুইন বোলার মাত্র চার জন। পঞ্চম ও ষষ্ঠ বোলিং অপশন হিসেবে সাইফ হাসান ও শামীম পাটোয়ারী। পঞ্চম বোলারের অভাবে মাঝে ভুগলেও রিশাদ হোসেন-নাসুম আহমেদ আর মোস্তাফিজুর রহমানের বোলিং জাদুতে পেন্ডুলামের মতো ঝুলতে থাকা ম্যাচটা বাংলাদেশ জিতল ৮ রানে।
এই জয়ে টিকে রইল বাংলাদেশের সুপার ফোরের আশা। এখন তাকিয়ে থাকতে হবে ১৮ সেপ্টেম্বরের শ্রীলংকা-আফগানিস্তান ম্যাচের দিকে। যেখানে বাংলাদেশ চাইবে শ্রীলংকার জয়। তিন ম্যাচ শেষে দুই জয়ে চার পয়েন্টে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠেছে বাংলাদেশ। যদিও এক ম্যাচ কম খেলা আফগানরা নেট রান রেটে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে। বাংলাদেশের নেট রান রেট -০.২৭০, আফগানিস্তান ২.১৫০।
ম্যাচের বর্ণনা দেয়ার আগে আগে লিটনদের ভাগ্য বদলানো মোড়ে আপনাকে একটু দাঁড় করিয়ে খানিকক্ষণ আগের স্মৃতিটা রোমন্থনের সুযোগ করে দিই।
ইনিংসের ১৬তম ওভারে আজমতউল্লাহ ওমরজাই তাসকিন আহমেদকে পুল করে মেরেছেন প্রায় ১০০ মিটার এক ছক্কা। পরের বলে তাসকিন গতি কমিয়ে আনলেন বলের, সেখানেই বাজিমাৎ। ফিফথ স্টাম্প লাইনে করা লেংথ ডেলিভারিতে ব্যাট স্ল্যাশ করার পর বল উঠল আকাশে, পয়েন্টে দারুণ এক ক্যাচ ধরলেন সাইফ হাসান। ডাগ আউটে কোচ জোনাথন ট্রট হতাশায় চেয়ারে বসে নিজের শরীরটা ছেড়ে দিলেন। হতাশ না হওয়ার কারণও নেই, ১৬ বলে ৩০ রান করা ব্যাটার আউট হলে যেকোনো কোচই এভাবে শরীর ছেড়ে দেবেন।
পঞ্চম বোলার না থাকায় সাইফ আর শামীমই ভরসা লিটনের। অবশ্য এই দুই বোলারকেই টার্গেট করেছিল আফগানিস্তান। তাদের করা চার ওভারে ৫৫ রান তুলেছে আফগানরা। তবে মোস্তাফিজ খুলে বসলেন নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি। নিজের শেষ ওভারে টানা দুই বলে নিলেন রশিদ খান আর গজনফরের উইকেট। বিশেষত রশিদ যেভাবে ব্যাট করছিলেন, ওই সময় তাকে থামাতে না পারলে ম্যাচের ফলাফল ভিন্ন হতো, বলাই বাহুল্য। অন্তত এই মোস্তাফিজকে ফাইন লেগ দিয়ে যেভাবে জায়গায় দাঁড়িয়ে দুটো বাউন্ডারি মেরেছেন, তাতে বাংলাদেশি সমর্থকদের বুকে কাঁপন ধরাতে যথেষ্ট ছিল। এর আগে মোহাম্মদ নবীকেও বোল্ড করেছেন দারুণ এক কাটারে। ইনিংস শেষ করেছেন চার ওভারে ২৮ রান দিয়ে তিন উইকেট নিয়ে।
এর আগে ইনিংসের প্রথম বলেই সাফল্য পায় বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টে প্রথমবার খেলতে নামা নাসুম আহমেদের বলের লাইন মিস করে এলবিডব্লিউ সেদিকউল্লাহ আতাল। রিভিউ নেননি, সোজা ড্রেসিংরুমের দিকে হাঁটা ধরেছেন এই বাঁহাতি ওপেনার। নিজের তৃতীয় ওভারে ফিরে আরো একটা সাফল্য নাসুমের, একইভাবে। এবার শিকার ইব্রাহিম জাদরান।
জাদরান অবশ্য ফিরতে পারতেন এর আগেই, ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে তাসকিন আহমেদের শেষ বলে রিশাদ হোসেন যদি তার লোপ্পা ক্যাচটা না ফেলতেন। যদিও সেই ক্যাচ ফেলাটা খুব বেশি ভোগায়নি বাংলাদেশকে। জাদরান মাত্র ৫ রান করায়। অবশ্য মোমেন্টাম আবারও ফিরতে পারত বাংলাদেশের দিকে, এই আফসোসটা করতেই পারেন লিটনরা।
যদিও তৃতীয় উইকেট জুটিতে ৩৩ রান তুলে বাংলাদেশকে ভালোই চাপে ফেলেছিল আফগানরা। সেই জুটিতেই ফুটে উঠেছিল বাংলাদেশের আরো একটা বোলারের কমতি। পঞ্চম বোলার হিসেবে আসা শামীম নিজের এক ওভারে দিয়েছেন ১৬ রান। চড়ে বসতে থাকা আফগানদের ব্যাটিংয়ে ছন্দপতন ঘটিয়েছেন আগের দুই ম্যাচে ধুঁকতে থাকা রিশাদ হোসেন। গুলবাদিন নাইবকে ফিরিয়েছেন ফিরতি ক্যাচে। মোস্তাফিজ তিনটি, নাসুম ও রিশাদ নিয়েছেন দুটি করে উইকেট।
টস জিতে বাংলাদেশ ব্যাট করতে নামে আগের দুই ম্যাচের ওপেনিং জুটি ভেঙে। তানজিদের সাথে সাইফ হাসানকে পাঠানো হয় পারভেজ ইমনের জায়গায়। এই টোটকাই যেন কাজে আসল বাংলাদেশের। নতুন জুটিতেপাওয়ারপ্লেতে বিনা উইকেটে ৫৯, যা এবারের এশিয়া কাপ তো বটেই, শেষ ১ও ইনিংসেও ওপেনিংয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ। যদিও এই জুটির শুরুটা ছিল নড়বড়ে।
নতুন বলে ফজলহক ফারুকীর আউট সুইংয়ের সাথে মানিয়েই নিতে পারেননি দুই ওপেনার। প্রথম ওভারের পঞ্চম বলে একটা অফ ড্রাইভ করে কভারে ক্যাচ তুললেও জীবন পেয়েছেন সাইফ। এক ওভার পরে তানজিদ জীবন পেয়েছেন দুবার, সেই ফারুকীর বলেই। প্রথমবার ব্যাটের কানা ছুঁয়ে স্লিপ আর কিপারে মাঝ দিয়ে এসেছে প্রথম চার। দুই বল পর লাইন মিস করে এলবিডব্লিউ হয়েও তানজিদ বেঁচে গেছেন আম্পায়ার্স কলে।
যদিও মোমেন্টামটা সেই ওভারেই গেছে বাংলাদেশের দিকে। ফারুকীর বলে আরো তিনটা চার মেরেছেন তানজিদ। রানের খাতা খোলার আগে জীবন পেয়ে সেটা দারুণভাবে কাজেও লাগিয়েছেন এই বাঁহাতি ওপেনার। ২৮ বলে তিন ছক্কা আর চারটি চারে ছুঁয়েছেন নিজের সপ্তম ফিফটি। তিন ছক্কার দুটো মেরেছেন স্লগ সুইপে আল্লাহ মোহাম্মদ গজনফরকে। আর শেষটা জুটেছে স্কয়ার লেগ দিয়ে মোহাম্মদ নবীর কপালে। নূর আহমাদের বলে ইব্রাহিম জাদরানের হাতে ক্যাচ দেয়ার আগে তানজিদের ব্যাট থেকে এসেছে ৫২ রানের ইনিংস।
অবশ্য তানজিদের সাথে ওপেনিংয়ে ৫৯ রানের জুটি গড়া সাইফও জীবন পেয়ে হাত খুলে খেলেছেন। রশিদ খানের নিচু হয়ে আসা এক বলে বোল্ড হয়েছেন এই ডানহাতি ব্যাটার। ইনিংসের প্রথম ছক্কাটাও এসেছে তার ব্যাট থেকে। দুই ছক্কা ও এক চারে ২৮ বলে করেছেন ৩০ রানে। কে কত রান করেছেন, এরচেয়ে বেশি মুখ্য হয়ে উঠেছিল তার ব্যাটিং ইন্টেন্ট।
ইনিংস বড় করতে পারেননি অধিনায়ক লিটন দাস, ১১ বলে করেছেন ৯ রান। পাঁচে নামা শামীম পাটোয়ারী আফগান স্পিনারদের সাথে মানিয়ে নিতে পারেননি। মিডল-ওভারে রানের দেখা পেতে বেশ কয়েকবার রিভার্স সুইপও করেছেন, কিন্তু ব্যাটে-বলে হয়নি কোনোটাই। রশিদের দ্বিতীয় শিকার এই বাঁহাতি ব্যাটার। তাওহিদ হৃদয়ের ব্যাট থেকে এসেছে ২০ বলে ২৬ রান।


