ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে মেহেরপুরের ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী বারাদি ছাগলের হাটে কেনাবেচা পুরোদমে জমে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের পদচারণায় এখন মুখরিত পুরো হাট প্রাঙ্গণ। বিশ্বজুড়ে সমাদৃত ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল’ জাতের ছাগলের ব্যাপক চাহিদা থাকায় এবারও এই জেলার হাটগুলোতে বেচাকেনার ধুম লেগেছে।
তবে হাটে আসা ব্যবসায়ীদের মতে, চলতি বছর বড় আকারের চেয়ে মাঝারি সাইজের ছাগলের প্রতিই ক্রেতাদের আগ্রহ ও ঝোঁক অনেক বেশি।
মেহেরপুর সদর উপজেলার বারাদি বাজারে অবস্থিত এই শতবর্ষী হাটটি জেলার সবচেয়ে বড় ছাগলের হাট হিসেবে সুপরিচিত। বছরের অন্য সময়ে সপ্তাহে সাধারণত শনি ও বুধবার নিয়মিত হাট বসলেও, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এখন অতিরিক্ত আরও একদিনসহ সপ্তাহে মোট তিন দিন হাট বসানো হচ্ছে। আশপাশের বেশ কয়েকটি জেলার মানুষের কাছে এই হাটের সুনাম দীর্ঘদিনের। বর্তমানে এখানে ছাগলের পাশাপাশি ভেড়াও বেশ ভালো সংখ্যায় কেনাবেচা হচ্ছে।
শনিবার সকালে হাটে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন জাত ও আকারের দেশি ছাগলে পুরো বাজার সয়লাব। সাদা, কালো, খয়েরি ও মিশ্র রঙের নানা জাতের ছাগল সারিবদ্ধভাবে নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। ক্রেতারাও দলবেঁধে ঘুরে ঘুরে ছাগল দেখছেন এবং পছন্দসই পশুর দরদাম করছেন। মনের মতো মিললেই অনেকে সঙ্গে সঙ্গে কিনে বাড়ি ফিরছেন।

হাট সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে, এবার হাটে বড় আকারের ছাগল ৪৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। তবে ১২ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা মূল্যের মাঝারি আকারের ছাগলের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু বাজারে সেই তুলনায় মাঝারি ছাগলের সরবরাহ কিছুটা কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
ঢাকা থেকে ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে আসা ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম কোরবানির জন্য একটি বড় ছাগল কিনতে বারাদি হাটে এসেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে পুরো হাট ঘুরে অবশেষে একটি ছাগল পছন্দ করে তিনি সেটি ৩৭ হাজার টাকায় কেনেন।
তিনি বলেন, ‘অনেকগুলো ছাগল দেখার পর এটি পছন্দ হয়েছে এবং দামও সাধ্যের মধ্যে থাকায় কিনে ফেললাম। মেহেরপুর শহরের আরেক বাসিন্দা আরিফুর রহমান একটি দেশি খয়েরি রঙের ছাগল কিনেছেন ৩৫ হাজার টাকায়।’
রবিউল জানান, ছাগলটিতে আনুমানিক ৪০ কেজির মতো মাংস হতে পারে। পরিবারের কয়েকজন সদস্যের গরুর মাংসে অ্যালার্জির সমস্যা থাকায় তারা এবার ছাগল কোরবানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
হাট ইজারাদার এম এ বারী ফারুক জানান, এবার হাটে দেশি ছোট জাতের ছাগলের সংখ্যাই প্রায় ৭৫ শতাংশ। এছাড়া ১৫ শতাংশ ক্রস রাম এবং ১০ শতাংশ ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগল রয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার ছাগলের চাহিদা অনেক বেড়েছে, ক্রেতারা মাঝারি আকারের ছাগল বেশি খুঁজছেন।

অবশ্য হাটে বিক্রেতাদের মাঝে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। মেহেরপুর সদর উপজেলার আমঝুপি গ্রামের খামারি হাসানুজ্জামান নিজের লালন-পালন করা চারটি ছাগল নিয়ে হাটে এলেও দুপুর পর্যন্ত কোনোটি বিক্রি করতে পারেননি। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে ক্রেতার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা এই খামারি জানান, অনেকেই এসে ছাগল দেখছেন কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম দিতে চাইছেন না। শেষ পর্যন্ত সঠিক দাম না পেলে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছেই ছাগলগুলো দিয়ে দিতে হবে।
অন্যদিকে মুজিবনগর উপজেলার ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম হাটে নয়টি ছাগল এনে দুপুরের মধ্যেই ছয়টি বিক্রি করে ফেলেছেন। তিনি আশাবাদী, বাকি তিনটিও দিনের আলো থাকতেই বিক্রি হয়ে যাবে। তবে তিনিও জানান, ক্রেতাদের বড় অংশই ১০ থেকে ২৪ হাজার টাকার মধ্যে ছাগল খুঁজছেন, যা বাজারে কিছুটা কম।
স্থানীয় ৬৫ বছর বয়সী মুদি ব্যবসায়ী আবু রায়হান হাটের প্রাচীনত্ব তুলে ধরে বলেন, তিনি জন্মের পর থেকেই এই হাটের কথা শুনে আসছেন। ঠিক কত বছর আগে এই হাট শুরু হয়েছিল, তা কেউ নিখুঁতভাবে বলতে পারে না। প্রাচীনকাল থেকেই চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহের মানুষ এখানে ছাগল নিয়ে আসতেন। সময়ের আবর্তনে এই হাটের পরিধি ও গুরুত্ব দুই-ই বহুগুণ বেড়েছে।
তবে এবারের হাটে ছাগল বিক্রির হাসিল বা টোল বাড়ানো নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। ব্যবসায়ীদের দাবি, গত বছর প্রতি ছাগলে ২৫০ টাকা করে হাসিল নেওয়া হলেও এবার ওজনভেদে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
এই অভিযোগ সম্পর্কে ইজারাদার রিপন মোল্লা জানান, তারা নিজেদের ইচ্ছামতো কোনো টাকা নিচ্ছেন না। বরং প্রশাসনের নির্ধারিত হার অনুযায়ীই হাসিল আদায় করা হচ্ছে।
এদিকে হাটের সার্বিক নিরাপত্তা ও পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একটি চিকিৎসক দল সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। তারা হাটে আসা পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন এবং খামারি ও ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। অনেক সচেতন ক্রেতাকেও ছাগল কেনার পর চিকিৎসকদের দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে নিতে দেখা গেছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ তোফাজ্জেল হোসেন জানান, কোরবানির পশুর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাটে নিয়মিত তদারকি চালানো হচ্ছে। কোনোভাবেই যাতে কোনো রোগাক্রান্ত বা অসুস্থ পশু বাজারে বিক্রি হতে না পারে, সে বিষয়ে তারা বিশেষ নজরদারি রাখছেন।


