মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি সচল করার দ্বিমুখী লক্ষ্য নিয়ে আগামী অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজার দর নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে নীতিগত সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। অন্যদিকে আগেই ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মূল হাতিয়ার হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।
মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্ট করেছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের এই দুই লক্ষ্যকে একসঙ্গে অর্জন করাই তাদের বর্তমান নীতির মূল ভিত্তি।
মুদ্রানীতিতে নীতিগত (রেপো) সুদহার ১০ শতাংশ, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনও স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নামেনি। তাই সামগ্রিকভাবে অর্থের দাম বেশি রাখার নীতি অব্যাহত থাকবে।
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, অর্থনীতিতে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদন বাড়ানোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
গভর্নরের ভাষায়, “ইনফ্লেশনের দুটি দিক আছে। একটি ডিমান্ড সাইড, আরেকটি সাপ্লাই সাইড। সাধারণভাবে অর্থের জোগান বাড়লে চাহিদা বাড়ে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়। সেই কারণেই আমরা নীতিগত সুদহার উচ্চ পর্যায়ে রেখেছি।”
কিন্তু ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি নিয়ে তিনি বলেন, “এই অর্থ ভোগ বাড়ানোর জন্য নয়, উৎপাদনের জন্য দেওয়া হবে। উৎপাদন বাড়লে সরবরাহ বাড়বে, উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং সেটি মূল্যস্ফীতি কমাতেও সহায়ক হবে।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা আসবে ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে। গ্রাহকরা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন এবং এর সুদের ৬ শতাংশ সরকার ভর্তুকি দেবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই অর্থ মূলত শিল্প, কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা (সিএমএসএমই) এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হবে।
ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু অতিরিক্ত চাহিদা নয়, বরং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারের কাঠামোগত সমস্যাও দায়ী। তাই কেবল কঠোর মুদ্রানীতির মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
এ কারণেই একদিকে নীতিগত সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, অন্যদিকে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।


