রংপুরের মিঠাপুকুর লাল মসজিদ মোগল আমলের এক অনন্য নিদর্শন, যেখানে মোগল ও স্থানীয় স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায়। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও মসজিদটি বর্তমানে চরম অবহেলার শিকার। এমনকি অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য বোর্ডটিও এখন আর পড়ার উপযোগী নেই। মসজিদের কারুকাজখচিত দেয়াল ও সৌন্দর্য এখন শ্যাওলায় ঢাকা। চারপাশে বহুতল ভবন নির্মাণের ফলে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি ক্রমেই আড়ালে চলে যাচ্ছে, যা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, মিঠাপুকুর-ফুলবাড়ী এশিয়ান হাইওয়ের ঠিক দক্ষিণে এবং মিঠাপুকুর গড় থেকে কিছুটা পশ্চিমে এই ঐতিহাসিক মসজিদের অবস্থান। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব ৩০৮ কিলোমিটার এবং রংপুর শহর থেকে ২৪ কিলোমিটার দক্ষিণে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মোগল আমলের শেষ দিকে শেখ মোহাম্মদ সাবেরের ছেলে শেখ মোহাম্মদ আসর এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদের দেয়ালজুড়ে মোগল খিলান ও কার্নিশের কাজ রয়েছে, আর গম্বুজের নিচে রয়েছে মারলন নকশা। মসজিদের চার কোণের মিনারগুলো অষ্টভুজাকৃতির এবং এগুলো ছাদ ছাড়িয়ে উপরে উঠে গম্বুজ আকৃতিতে শেষ হয়েছে। তিনটি বড় গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের ভেতরে রয়েছে একটি উন্মুক্ত আঙিনা। প্রবেশপথে তিনটি সুনিপুণ কারুকাজ করা পথ এবং ছোট ছোট মিনার রয়েছে। পশ্চিম দিকের দেয়ালে তিনটি মেহরাব রয়েছে, যা চমৎকার টেরাকোটা বা পোড়ামাটির শিল্পকর্মে সজ্জিত। এর সমতল ছাদ ও সামনের চত্বরে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাব স্পষ্ট, যার মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী চারচালার আদলে তৈরি প্রবেশদ্বার।
স্থাপত্যশৈলীর এই ভিন্নতা নিয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং গবেষক মো. সোহাগ আলী বলেন, “অনেকে একে বড় মসজিদ বললেও এর জায়গার পরিধি বেশ সীমিত। এই মসজিদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো মোগল স্থাপত্যের সাথে স্থানীয় উপাদানের সমন্বয়। যেমন, এর প্রবেশদ্বারটি দেখতে অনেকটা গ্রামের ছনের ঘরের চালের মতো। আবার চারটি খুঁটি বা পিলার দেখলে মনে হয় যেনমাটির পাতিল থেকে বের হচ্ছে, যা গ্রামবাংলার পাতিল থেকে বেড়ে ওঠা কলাগাছের কথা মনে করিয়ে দেয়। লতাপাতার নকশাগুলোতেও গ্রামীণ নারীদের পছন্দের ছাপ রয়েছে। এই মিশ্রণই মসজিদটিকে অনন্য করে তুলেছে।”
স্থানীয়দের মধ্যে জনশ্রুতি রয়েছে যে, এই মসজিদটি মাটি ফুঁড়ে উঠেছে এবং এখানে দোয়া করলে তা কবুল হয়। এ কারণে দেশ-বিদেশের বহু মানুষ এখানে ছবি তুলতে ও তথ্য সংগ্রহ করতে আসেন। কিন্তু তাদের সহযোগিতা করার জন্য এখানে কোনো গাইড বা দিকনির্দেশনা নেই। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নামমাত্র একটি ১২ বাই ১২ ইঞ্চির সতর্কবার্তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে। মসজিদের মিনার ও দেয়ালগুলো ধুলোবালি ও শ্যাওলায় ছেয়ে গেছে। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অধিদপ্তরের হলেও নামাজিদের জন্য নেই কোনো স্থায়ী অজুখানা। সব মিলিয়ে প্রাচীন এই মসজিদটি এখন অভিভাবকহীন এক অনাথ স্থাপনার মতো দাঁড়িয়ে আছে। নামাজের সময় ছাড়া বাকিটা সময় মসজিদটি বন্ধ থাকে। ১১.৫৮ মিটার দীর্ঘ ও ৪.৪২ মিটার প্রস্থের এই প্রাচীন স্থাপনাটি এখন বহুতল ভবনে আটকা পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ বিল্লাহ আক্ষেপ করে বলেন, “ছোটবেলা থেকেই দেখছি মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে। কিন্তু এখানে কোনো অজুখানা নেই। রাস্তার ধারে কোনো দিকনির্দেশনা বা তথ্য বোর্ড নেই। উপরন্তু, চারদিকে বড় বড় ভবন ওঠায় মসজিদটি আর দূর থেকে দেখাই যায় না। মানুষ অনেক আশা নিয়ে দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে যান।”
মিঠাপুকুর হাফিজিয়া মাদ্রাসার সহকারী প্রধান শিক্ষক সদরুল আলম জানান, মসজিদটি ২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। পর্যটকরা আসলেও সরকারিভাবে এটি প্রচার বা সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। মসজিদের মুয়াজ্জিন মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই এই মসজিদে নামাজ পড়ছি। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এটি দেখতে আসে। এখানে নামাজ পড়তে খুব ভালো লাগে।”
মিঠাপুকুরের রাজনীতিবিদ এম এম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর বলেন, “প্রাচীন স্থাপনা অবহেলা করা মানে বিশ্বের সম্পদ নষ্ট করা। মিঠাপুকুর লাল মসজিদ শ্যাওলায় ঢেকে যাচ্ছে। আমরা চাই স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে এর সংরক্ষণ করা হোক। এখানে একটি ইসলামিক গবেষণা কেন্দ্র, লাইব্রেরি ও ট্রেনিং সেন্টার করা হলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্বজুড়ে উজ্জ্বল হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে ভবন নির্মাণে অধিদপ্তরের অনুমতি বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে মো. সোহাগ আলী বলেন, “আইন অনুযায়ী প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের পাশে ভবন নির্মাণে বিধিনিষেধ আছে। জেলা প্রশাসন ও অধিদপ্তরকে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ফিল্ড অফিসার আবু সাঈদ ইনাম তানভিরুল ইসলাম বলেন, “মিঠাপুকুর লাল মসজিদ আমাদের অধীনে রয়েছে। আগামী বছর থেকে এর প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ শুরু হবে এবং আইন অনুযায়ী সীমানার ভেতরে কোনো অবৈধ নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।”
রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুল ইসলাম জানান, “ঐতিহ্য রক্ষায় আমরা সচেতন। এই মসজিদটি ২২৪ বছরের এক বাতিঘর। এটি রক্ষায় আমরা প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”


