মাদারীপুর জেলায় ঐতিহ্যবাহী নদী-কেন্দ্রিক জীবনযাত্রা ক্রমশ ত্যাগ করছেন বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা এখন ডাঙায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন, নিজেদের ছেলেমেয়েদের স্কুল-মাদ্রাসায় ভর্তি করাচ্ছেন।
মাদারীপুর সদর, কালকিনি, ডাসার, রাজৈর এবং শিবচর উপজেলার বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা ও নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে এখন তাদের উপস্থিতি চোখে পড়ে।
বেদে সম্প্রদায়ের নেতা দয়াল সর্দার বলেন, “নদী এখন শুকিয়ে যাচ্ছে। আমরা আর আগের মতো সব জায়গায় নৌকায় করে যাতায়াত করতে পারি না। আমরা নৌকায় চড়ে শিবচরে এসেছিলাম এবং গত প্রায় ২০ বছর ধরে ডাঙায় বসবাস করছি। আমাদের অনেক পরিবারের এখন স্থায়ী বাড়িঘর হয়েছে এবং আমরা এখানকার নিবন্ধিত ভোটার। আমাদের সন্তানরা এখন স্কুল ও মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছে। অথচ আগে আমাদের জন্য শিক্ষার কোনো সুযোগই ছিল না।”
ঐতিহ্যগতভাবে সাপ ধরা এবং লোকজ কবিরাজি চিকিৎসার সাথে জড়িত থাকলেও, বেদে সম্প্রদায়ের অনেক তরুণ এখন নতুন নতুন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। তাদের কেউ কেউ ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালাচ্ছেন, আইসক্রিম বা স্ন্যাক্স বিক্রি করছেন, আবার কেউ রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করছেন। নারীরা আগে ঐতিহ্যবাহী কাজের জন্য গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন, তারাও এখন ছোটখাটো ব্যবসার মাধ্যমে পরিবারের আয়ে অবদান রাখছেন।
শিবচরের মাদবরেরচরে অন্তত ৫০টি বেদে পরিবারের প্রায় ২৫০ জন সদস্য ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের পাশে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছেন। শুরুতে তারা ছোট ছোট কুঁড়েঘরে বসবাস করলেও, আর্থিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় এখন তারা বড় বড় বাড়ি তৈরি করছেন।
বেদে সম্প্রদায়ের সদস্য জোসনা বেগম বলেন, “আমরা আগে ঝাড়ফুঁক ও কবিরাজি ওষুধ বিক্রির জন্য গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতাম। এখন সেই কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে। বর্তমানে আমাদের পুরুষেরা বিভিন্ন পেশায় কাজ করছেন এবং নারীরা ছোটখাটো ব্যবসা বা কখনো কখনো চেয়েচিন্তে সংসার চালাচ্ছেন। আমাদের জীবন ও জীবিকা এখন পুরোপুরি বদলে গেছে।”
শিবচর উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক শাজাহান মোল্লা সাজু বলেন, “বেদে সম্প্রদায়ের এই মানুষগুলো দীর্ঘদিন ধরে এখানে বসবাস করছেন। আমি এই পরিবারগুলোকে তাদের সন্তানদের স্কুল ও মাদ্রাসায় পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছি। এখন তাদের অনেক সন্তানই পড়াশোনা করছে।”
মাদবরেরচর ইউনিয়নের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান রানু আক্তার জানান, “আমাদের বাড়ির কাছেই প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি বেদে পরিবার বসবাস করে। আমার দায়িত্ব পালনকালে আমরা তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছি। তারা কারও কোনো ক্ষতি করে না, বরং ধীরে ধীরে স্থানীয় সমাজের মূল স্রোতের সাথে মিশে যাচ্ছে।”
বেদে সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবন এখন আশেপাশের সাধারণ মানুষের মতোই হয়ে উঠেছে। সকাল হলেই পুরুষেরা কাজের সন্ধানে বাইরে চলে যান, স্কুল বা মাদ্রাসায় যায় শিশুরা। শিক্ষা ও বহুমুখী পেশা গ্রহণের মাধ্যমে এই সম্প্রদায়টি ধীরে ধীরে সমাজের মূল ধারার অংশ হয়ে উঠছে।


