পদ্মা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার নতুনকান্দি গ্রাম। বিস্তীর্ণ এই চরাঞ্চলে বসবাস করেন সহস্রাধিক মানুষ। যাদের প্রতিটি দিন কাটে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে। এখানে বর্ষা মানেই বন্দিজীবন, আর কাদা-জল মানেই নিত্যদিনের সহচর। বর্ষার শুরু থেকে শীতের আগ পর্যন্ত এই চরের মানুষের জীবনের চাকা থমকে থাকে এক চিলতে নৌকার ওপর।
মাদবরেরচর ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের এই জনপদে যাতায়াতের গল্পটা বড়ই করুণ। চরের বাসিন্দাদের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি বিশাল মরা নদী বা খাল। এক সময় এখানে প্রমত্তা নদী ছিল, এখন তা বড় এক জলাশয়। এই জলাশয়ের দুই পাড়ে টানানো রয়েছে একটি শক্ত দড়ি। সেই দড়ি টেনে টেনে মাঝিশূন্য এক নৌকায় চড়ে মানুষকে পার হতে হয়।
এই নৌকায় কোনো পেশাদার মাঝি নেই। নৌকায় যখন যে যাত্রী ওঠেন, নিজের প্রয়োজনে তাকেই মাঝির ভূমিকা নিতে হয়। কাদা মাড়িয়ে নৌকায় উঠে দড়ি টেনে টেনে এপার থেকে ওপারে যেতে হয় চরের বাসিন্দাদের। স্কুলপড়ুয়া শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সবাইকে এই ঝুঁকি নিয়েই পথ চলতে হয়। বর্ষায় যখন খালটি কানায় কানায় ভরে ওঠে, তখন এই পারাপার হয়ে ওঠে আরও বিপজ্জনক।
দিনের আলোয় কোনোমতে দড়ি টেনে পার হওয়া গেলেও সন্ধ্যা নামলে যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। চরের বাসিন্দা সোহাগ শিকদার জানান, রাতে নৌকা চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক সময় ছোট নৌকা উল্টে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় চরের এই মানুষগুলো যেন পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
যাতায়াত ব্যবস্থার এই বেহাল দশা মাঝেমধ্যে জীবনের প্রদীপও নিভিয়ে দিচ্ছে। রহিমা বেগম নামের এক বাসিন্দা শোনালেন এক করুণ কাহিনী। একবার একজনকে সাপে কাটার পর হাসপাতালে নেওয়ার জন্য কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসতে হয়েছিল। কিন্তু পথেই অনেকটা সময় নষ্ট হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার অভাবে মানুষটি মারা যান। জরুরি কোনো রোগী বা গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নেওয়া এখানে এক দুঃসাধ্য লড়াই।
চরের অধিকাংশ মানুষ কৃষি, পশুপালন আর মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের উৎপাদিত পণ্য শিবচরের ঐতিহ্যবাহী মাদবরেরচর হাটে নিতে গেলেই চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। যাতায়াত সমস্যার কারণে চরের শিশুরা ঠিকমতো স্কুলে যেতে পারে না। স্থানীয় বাসিন্দা সোহেল রানা ও কৃষক সারোয়ার হোসেনের দাবি, এখানে একটি ব্রিজ নির্মাণ করা হলে সহস্রাধিক মানুষের দীর্ঘদিনের এই কষ্ট দূর হতো।
পদ্মার ভাঙা-গড়ার খেলায় টিকে থাকা এই মানুষগুলোর চাওয়া খুব সামান্য—একটি টেকসই রাস্তা আর একটি ব্রিজ। দড়ি টানা নৌকার এই জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে তারা যুক্ত হতে চান মূল ভূখণ্ডের উন্নয়নের মূল স্রোতে। কবে শেষ হবে তাদের এই জল-কাদার লড়াই, সেই অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন নতুনকান্দির সহস্রাধিক প্রাণ।


