চট্টগ্রাম নগরীতে মশার তীব্র উপদ্রব এবং সেই সঙ্গে ঘনঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে এই দ্বিমুখী সমস্যায় ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশেষ করে সন্ধ্যা নামার পর মশার উপদ্রব ও বিদ্যুৎ বিভ্রাট চরম আকার ধারণ করায় বাসা-বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
হালিশহর এলাকার বাসিন্দা ফাহিমা বেগম জানান, সারাদিন মশা থাকলেও সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে। সন্ধ্যার আগে ঘরের জানালা বন্ধ না করলে রাতে ঘরে টেকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, কয়েল, অ্যারোসল বা ইলেকট্রিক ব্যাট ব্যবহার করেও মশা থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক পরিবার দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে।
মশার উপদ্রব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিরা। এর মধ্যে অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে প্রচণ্ড গরমে ফ্যান বা কুলিং সিস্টেম চালানো সম্ভব হচ্ছে না, যা মানুষের ভোগান্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আকবর শাহ এলাকার বাসিন্দা মনিরুল কবির তার কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারছেন না। সারাদিন কাজ শেষে রাতেও কোনো শান্তি নেই। অনেক সময় মাঝরাতে বিদ্যুৎ গিয়ে সকাল পর্যন্ত আর আসে না।
কোতোয়ালি এলাকার বাসিন্দা উম্মে সাইদা জানান, ঘরে শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে তারা চরম বিপাকে আছেন। মশা ও লোডশেডিং এক সঙ্গে জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মশা নিধনে ৪১টি ওয়ার্ডে বিশেষ ‘ক্রাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় সকালে লার্ভিসাইড এবং বিকালে অ্যাডাল্টিসাইড ছিটানো হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী জানান, মশা মারতে তারা বিটিআই লার্ভিসাইড এবং ডেল্টামেথ্রিন ব্যবহার করছেন। তবে মশার আচরণ পরিবর্তন এবং রাসায়নিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ায় নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে পদ্ধতি পরিবর্তনের কথা জানান তিনি।
অন্যদিকে, এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র হয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রামে সাধারণত ১৩শ’ থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৯০০ থেকে এক হাজার মেগাওয়াট।
পিডিবি’র চট্টগ্রাম পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ সার্কেলের (পূর্ব) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ কে এম জসিম উদ্দিন জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে নগরীতে ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় চব্বিশ ঘণ্টাই দফায় দফায় লোডশেডিং হচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ রেশনিং করার বিষয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাননি বলে জানান তিনি।
পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় গরম, লোডশেডিং ও মশার অত্যাচারে আগামী দিনগুলোতে জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক জীবন আরও সংকটে পড়ার আশঙ্কা করছেন নগরবাসী।


