‘মর্গে গিয়ে দেখি তিন, চারশ লাশ। একটার ওপর একটা লাশ পড়ে আছে।’ ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইলকে খুঁজতে গিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে এমন দৃশ্য দেখার বর্ণনা দিয়েছেন তার মা তাসলিমা আক্তার। ছেলের পরনের পোশাক দেখে লাশ শনাক্ত করেন তিনি। তার মাথায় গুলির আঘাত ছিল।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ও হামলার ঘটনায় শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলায় সোমবার আদালতে জবানবন্দি দেন তিনি।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তাসলিমার জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ। জবানবন্দি দেওয়ার সময় বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন ইসমাইলের মা।
জবানবন্দিতে তাসলিমা বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজের পর দুপুরের খাবার খেয়ে আনুমানিক বেলা ৩টার দিকে বাসা থেকে বের হন আমার ছেলে ইসমাইল। আল্লাহ করিম মসজিদের পাশে গ্লাস ফ্যাক্টরির সামনে আন্দোলনে যোগ দেয় সে।’
তাসলিমার ভাষ্য, ‘সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ইসমাইলের বন্ধু মনির তাকে জানান, আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে ইসমাইলকে দেখেছেন তিনি। মনির তাকে বাসায় ফিরে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু ইসমাইল বাসায় না ফিরে আন্দোলনে থেকে যান।’
তাসলিমা জানান, নিজের ফোনে টাকা না থাকায় ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি। পরে তার বোন আকলিমা ইসমাইলকে ফোন করেন। কয়েকবার ফোন করার পর ইসমাইলের বন্ধু কালু ফোন ধরে জানতে চান, ইসমাইল তার কে হন। আকলিমা নিজেকে ইসমাইলের খালা পরিচয় দিলে কালু জানান, ইসমাইল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং তাকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে।
খবর পেয়ে তাসলিমা তার মা ও বোনকে নিয়ে ঢাকা উদ্যান থেকে রিকশায় ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন। পথে আগুন জ্বলতে দেখেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন তিনি। এ সময় কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, জাহাঙ্গীর কবির নানক, তাপস ও বিপ্লবের হাতে অস্ত্র ছিল বলে অভিযোগ করেন তাসলিমা। তার সামনে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলেও জানান তিনি।
রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে পৌঁছান তাসলিমা। জরুরি বিভাগে গিয়ে গুলিবিদ্ধবহু মানুষকে জীবিত ও মৃত অবস্থায় দেখতে পান বলে জবানবন্দিতে জানান তিনি। বিভিন্ন জায়গায় ছেলেকে খুঁজতে থাকেন। পরে এক চিকিৎসককে ছেলের খোঁজ করতে বললে তিনি তাসলিমাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে ছেলে নেই জানালে কিছুক্ষণ পর চিকিৎসক মোবাইল ফোনে একটি ছবি দেখান। ছবিটি দেখে ইসমাইলকে শনাক্ত করেন তাসলিমা।
এরপর ছেলের অবস্থান জানতে চাইলে চিকিৎসক তাকে হাসপাতালের মর্গে নিয়ে যান। সেখানে তিনশ থেকে চারশটি লাশ একটির ওপর আরেকটি রাখা ছিল বলে বর্ণনা দেন তাসলিমা। ছেলের পরনের পোশাক দেখে তাকে শনাক্ত করেন তিনি। ইসমাইলের মাথায় গুলির আঘাত ছিল বলেও জানান।
তাসলিমা বলেন, ছেলের লাশ চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে জানায়, সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এলে তবেই লাশ দেওয়া হবে। পরদিন শনিবার সকাল ১১টার দিকে মোহাম্মদপুর থানা থেকে সাইফুল দারোগা হাসপাতালে আসেন। ওই দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইসমাইলের লাশ বুঝে পেয়ে বাসায় নিয়ে যান তিনি। হাসপাতাল থেকে মামলা করবেন না, এ মর্মে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তাসলিমা।
পরে ছাতার মসজিদে ছেলেকে গোসল করিয়ে জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করেন বলে জবানবন্দিতে জানান তিনি।
হত্যার জন্য যাদের দায়ী করেছেন মা
ছেলের হত্যার জন্য পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, কমিশনার আসিফ, কমিশনার রাজিব, রাসেল, মোল্লা রুবেল, কমিশনার আসিফের পিএস বিপ্লব, বিপ্লব কুমার, সৈকত, সাজ্জাদ পলাশ, সাত্তার, মোহাম্মদ ইসমাইল, রাষ্ট্রন ও রওশনসহ আরও অনেককে দায়ী করেন তাসলিমা।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘তার মেয়ে রশ্নি তাকে ইউটিউবে ইসমাইল হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দেখিয়েছেন। তিনি যে এলাকায় থাকেন, সেখানকার অনেকেও ভিডিওটি দেখে তাকে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কথা জানিয়েছেন। জবানবন্দিতে তাসলিমা ছেলের হত্যার বিচার দাবি করেন।’


