দৈনিক ভোরের কাগজের অনলাইন এডিটর মিজানুর রহমান সোহেলকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) পরিচয়ে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার পর স্ত্রীর জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
মিজানুর রহমান সোহেল অনলাইন এডিটরস অ্যালায়েন্সের সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। মঙ্গলবার রাত ১২টার পর ঢাকার উত্তর বাড্ডার বাসা থেকে তাকে তুলে নেওয়া হয়। প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা বুধবার সকালে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ছাড়া পাওয়ার পর টাইমস অব বাংলাদেশকে মিজানুর রহমান সোহেল বলেন, ‘বাকস্বাধীনতা হরণ করতে এবং গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতেই মধ্যরাতে আমাকে বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল।’
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রাত ১২টার পর ৫-৬ জন ব্যক্তি ডিবি পরিচয়ে মিজানুর রহমানের বাসায় প্রবেশ করেন। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন আশরাফুল নামের একজন ডিবি সদস্য।
মিজানুর রহমানের স্ত্রী সুমাইয়া সিমা জানান, পুলিশ সদস্যরা কোনো পরোয়ানা দেখাতে পারেননি। ডিবি প্রধান (অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম) তার সঙ্গে কথা বলতে চান জানিয়ে তারা বলেন, কথা শেষ হলেই তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হবে। তবে পরবর্তীতে আশরাফুল নামের ওই পুলিশ সদস্যকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
ঘটনার সত্যতা জানতে প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ডিবি প্রধানের সঙ্গে কথা বলেন। এক ফেইসবুক পোস্টে তিনি জানান, ‘কেন এক সাংবাদিককে মধ্যরাতে তুলে এনে কথা বলতে হবে’ এমন প্রশ্ন নিয়ে ডিবি প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বীকার করে বলেন, মিজানুর রহমান সোহেলকে ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়েছে। মধ্যরাতে বাসা থেকে তুলে আনার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। তবে সেই ‘সুনির্দিষ্ট তথ্য’ কী, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া ‘ডিবি প্রধান কথা বলবেন’—এমন অজুহাতে মিজানুর রহমান সোহেলকে তুলে নেওয়ায় সাংবাদিক সমাজ ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এর প্রতিবাদ জানিয়ে পোস্ট দেন।
পরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ কার্ডে সোহেলের মোবাইল নাম্বার ভুলক্রমে সোহেল দিয়ে দিয়েছিলেন। সেই সূত্রে তাকে ডিবি অফিসে নেওয়ার পর সোহেল নিজের ভুল বুঝতে পারলে তাকে তার সংগঠনের নেতাদের মাধ্যমে তার স্ত্রীর জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ছাড়া পাওয়ার পর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে সোহেল জানান, ‘বিনা অপরাধে প্রায় সাড়ে ১০ ঘণ্টা ডিবি হেফাজতে থাকার পর তারা আমাকে স্বসম্মানে মাত্র বাসায় পৌঁছে দিয়েছে। গত রাত ১২টার দিকে ডিবি প্রধান আমার সঙ্গে কথা বলবেন, এই অজুহাতে ৫/৬ জন ডিবি সদস্য জোর করে আমাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। ডিবিতে নিয়ে আসামীর খাতায় আমার নাম লেখা হয়। জুতা-বেল্ট খুলে রেখে গারদে আসামীদের সাথে আমাকে রাখা হয়। কিন্তু কেন আমাকে আটক করা হলো? তা আমি যেমন জানতাম না, তেমনি যারা আমাকে তুলে এনেছিলেন বা ডিবির উর্দ্ধতন কর্মকর্তারাও কিছু বলতে পারেননি।’
আটক করার কারণ জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘দীর্ঘ সময় পর বুঝতে পারলাম, সরকারের একজন উপদেষ্টার ইশারায় মাত্র ৯ জন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে মনোপলি ব্যবসা করার সুযোগ দেয়ার জন্যই আমাকে আটক করা হয়েছিল। আমার সাথে সংগঠনের সেক্রেটারি আবু সাঈদ পিয়াসকেও আটক করা হয়। তিনি এখনও ডিবি কার্যালয়ে আছেন।’
তিনি জানান, ‘আজ (বুধবার) ন্যাশনাল ইক্যুইপমেন্ট আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্টার (এনইআইআর) নিয়ে ডিআরইউতে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশ (এমবিসিবি)-এর প্রেস কনফারেন্স করার কথা ছিল। আমি সেখানে ছিলাম মিডিয়া পরামর্শক। সেই প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করাই তাদের প্রধান টার্গেট ছিল। কিন্তু তাদের জন্য আফসোস, যে উদ্দেশ্যে তারা প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতে চাইলো সেটা দেশের সবাই জেনে গেল।’
‘দেশের মুক্ত বাণিজ্য নীতির সঙ্গে এনইআইআর স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক। প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে দেশে প্রতিযোগিতা কমিশনও রয়েছে। অথচ মাত্র ৯ জন ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে সারাদেশে ২৫ হাজার মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে পথে বসানোর গভীর চক্রান্ত চলছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে গ্রামের সাধারণ মানুষ, প্রবাসীসহ অনেকেই বিপদে পড়বেন। একটা চেইন ভেঙ্গে পড়বে। অনেক ব্যবসায়ী পথে বসে যাবে। জেনে রাখা ভালো, এই ৯ জনের একজন ওই উপদেষ্টার স্কুল-বন্ধু।’
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘একটা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কথা বললে সরকার কেন ভয় পায়? শুধুমাত্র প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতেই কি আমাকে গভীর রাতে জোর করে তুলে নিতে হলো? যারা মুখে “বাকস্বাধীনতার” বুলি আওড়ান, তারাই কি আমাকে বাকরুদ্ধ করতে এই আয়োজন করলেন? মগের মুল্লুকে এই কি তবে বাকস্বাধীনতার বাস্তব চিত্র?’


