চট্টগ্রাম নগরীর সিআরবি এলাকায় রেলওয়ে অফিসারস ক্লাবের পাহাড়ঘেঁষা ঢালে সারি সারি ঝুপড়ি ঘর। শহরের ব্যস্ততার মাঝখানে এই ছোট্ট বসতি যেন অন্য এক বাস্তবতা। এখানে বসবাসকারীদের কাছে নির্বাচন মানে শুধু ভোট নয়, বরং মাথা গোঁজার নিশ্চয়তা চাওয়ার উপায়, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্প।
৬৬ বছর বয়সী শাহজাহান বেগম প্রায় চার দশক ধরে এই পাহাড়ের ঢালে আছেন। তার তিন সন্তানের জন্মও এখানেই। দুই ছেলে বিয়ে করে অন্যত্র থাকলেও মেয়ে এখনো তার সঙ্গে। জাতীয় পরিচয়পত্র আছে, ভোটার তালিকায় নামও রয়েছে চট্টগ্রাম-৯ আসনে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সুবিধা বলতে তার কাছে এই পরিচয়পত্রই একমাত্র প্রাপ্তি। বয়স্ক ভাতা বা অন্য কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধা পাননি।
নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। তবু এখনো কোনো প্রার্থী তার দরজায় আসেননি। শাহজাহান বেগম শান্ত গলায় বলেন, ‘কেউ এখনো ভোট চাইতে আসেনি, আসতে পারে। বহু বছর ভোট দেওয়া হয়নি, এবার চাইলে দেবেন। তার কথায় প্রত্যাশার চেয়ে বাস্তবতার সুরই বেশি।’
শাহজাহান বেগমের ঘরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সরু একটি ঝিরি। অল্প পানির উপর একটি ইট রাখা আছে। সহজে পার হওয়া গেল। ওপারে ৭০ বছর বয়সী রোজিনা বেগমের বসতি। তিনি, তার দুই বোন ও দুই ভাই প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে এই রেলওয়ে পাহাড়ের ঢালেই বাস করছেন। এখানেই তাদের সন্তানদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বয়স হলেও কোনো বয়স্ক ভাতা পাননি তারা। শৈশবে কুমিল্লা থেকে এসে গড়ে তোলা এই জীবনে রাষ্ট্রীয় সহায়তার ছোঁয়া খুব কমই পেয়েছেন।
ভোট নিয়ে তাদের আগ্রহ সীমিত। বরং বড় দুশ্চিন্তা উচ্ছেদের ভয়। ফাতেমা বেগম বলেন, কখন রেলওয়ের লোক এসে ঘর ভেঙে দেয় সেই শঙ্কায় থাকেন। ভোট চাইতে কেউ এলে তারা আগে জানতে চান, থাকার নিশ্চয়তা মিলবে কি না।
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা, ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ সুজন টঙ দোকান চালিয়ে সংসার চালান। তিনিও এই আসনের ভোটার। তার কাছেও এখনো কোনো প্রার্থী যাননি। নির্বাচন নিয়ে তার ভাবনা বাস্তবমুখী, জীবিকা আর নিরাপত্তাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
ঝিরির পাশেই দেখা যায় একটি নির্বাচনী ক্যাম্প। চট্টগ্রাম-৯ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আবু সুফিয়ানের প্রচার ক্যাম্প হলেও সেখানে তখন কাউকে পাওয়া যায়নি। নির্বাচনী উত্তাপ শহরের অন্যত্র যতটা দৃশ্যমান, পাহাড়ের ঢালের এই জনপদে তার উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
চট্টগ্রাম-৯ আসনটি কোতোয়ালি, বাকলিয়া ও চকবাজার থানা নিয়ে গঠিত। এখানে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৩। এই আসনে বিএনপির আবু সুফিয়ান ছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর এ কে এম ফজলুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের হাসান মারুফ রুমী, জেএসডির আবদুল মোমেন চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলনের আব্দুস শুক্কুর, ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মুহাম্মদ ওয়াহেদ মুরাদ, ইনসানিয়াত বিপ্লবের মোহাম্মদ নঈম উদ্দিন, নাগরিক ঐক্যের নুরুল আবছার মজুমদার, বাসদ (মার্কসবাদী) মো. শফিউদ্দিন কবির এবং জনতার দলের হায়দার আলী চৌধুরী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নির্বাচনী সমীকরণে এই পাহাড়ি বসতির মানুষ সংখ্যায় হয়তো খুব বড় নয়। কিন্তু তাদের গল্প নগর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। ভোটের আগে তারা প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি খোঁজেন স্থায়ী নিরাপত্তা, ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বীকৃত নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। নির্বাচন তাদের কাছে তাই শুধু রাজনৈতিক আয়োজন নয়, বরং টিকে থাকার প্রশ্ন।


