ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আগের চেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই সরকারের শাসনামলে নেওয়া প্রধান সংস্কার উদ্যোগগুলো নিয়ে প্রকাশিত ‘রিফর্ম বুকে’ এই দাবি করা হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বইটিতে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে নেওয়া সংস্কারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
রোববার সকালে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায়।
রিফর্ম বুকে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি, শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি সম্পর্ক উন্নয়নের প্রসঙ্গও উল্লেখ করা হয়েছে। সে প্রসঙ্গেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য আনার বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলে থরা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই ভারতের সঙ্গে খারাপ হতে শুরু করে বাংলাদেশের সম্পর্ক। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের পক্ষ থেকে যেমন ভারতবিরোধী বক্তব্য আসতে শুরু করে, তেমনি সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও নানা সময়ে নানা বক্তব্য দেওয়া হয়। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দেওয়ায় এবং বাংলাদেশের চাহিদা অনুযায়ী তাকে ফেরত না দেওয়ায় দুদেশের সম্পর্ক খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়ায়।
এমন যখন বাস্তবতা, তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো, ‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিক সম্মানভিত্তিক করা হয়েছে।’
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতিত সরকারের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে ‘আর নয়’ স্লোগানে রাজপথে নামে দেশের কোটি কোটি জনতা। তরুণ-তরুণীসহ গণ মানুষের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রায় ১৬ বছরের দমনমূলক শাসন থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পায় বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের গভীর সংকটে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশ চরম অর্থনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও গণতান্ত্রিক বিপর্যয়ের মধ্যে ছিল। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অপশাসনে রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে পড়ে। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে শত শত বিলিয়ন ডলার পাচার হয়, খেলাপি ঋণে বিপর্যস্ত হয় ব্যাংকিং খাত। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো রাজনৈতিক ও ব্যক্তিস্বার্থের অধীন হয়ে পড়ে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজনৈতিক দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, বিচার বিভাগে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়। ভোটারবিহীন নির্বাচন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হ্রাস এবং নাগরিক সমাজের কার্যক্রম স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
এ প্রেক্ষাপটে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশকে সঙ্গে নিয়ে দেশের নানা খাতে সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিভিন্ন খাতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠন করা হয় সংস্কার কমিশন।
কমিশনগুলোর সুপারিশ ও সরকারের নিজস্ব উদ্যোগে মেয়াদকালের মধ্যেই বাস্তবায়নযোগ্য আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো গ্রহণ করা হয়।
প্রেস উইংয়ের তথ্যমতে, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১৮ মাসে প্রায় ১৩০টি আইন (নতুন ও সংশোধিত) প্রণয়ন করেছে এবং ছয়শটিরও বেশি নির্বাহী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ সংস্কার এরইমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির মাধ্যমে প্রায় সাত হাজার চারশ পণ্যে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়া গেছে। চীনের সঙ্গে সহযোগিতায় ঋণের মেয়াদ পুনর্নির্ধারণ, স্বাস্থ্য খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং যৌথ জলতথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে।
এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক শুল্কহার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা হয়েছে।
জবাবদিহি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে উল্লেখ করে প্রেস উইং জানায়, পতিত সরকারের আমলের শতাধিক রাজনীতিক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়েছে। জব্দ বা জব্দের প্রক্রিয়ায় রয়েছে বিলিয়ন ডলারের সম্পদ।
ব্যাংকিং খাতে তদারকি জোরদার, ৪২টি মন্ত্রণালয়ে ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরাতে তদন্তের মুখে এক হাজার ২শরও বেশি কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে।
বিশেষ কমিশনের মাধ্যমে হাজারও ভুক্তভোগী ও পরিবারের সাক্ষ্য নিয়ে সত্য উদঘাটন ও জবাবদিহির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের কাঠামো পরিবর্তন করে এর নাম রাখা হয়েছে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সব আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক অধীনে আনা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, যোগ্যতাভিত্তিক পদ্ধতিতে বিচারপতি নিয়োগ চালু হয়েছে বলেও জানানো হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
প্রেস উইং দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথাও উল্লেখ করেছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহারের পাশাপাশি আগে বন্ধ থাকা গণমাধ্যম পুনরায় চালুর অনুমতি দিয়েছে সরকার। এমনকি সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ কোনো গণমাধ্যমও বন্ধ করা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
এতে আরও বলা হয়, সাত মাসব্যাপী টেলিভিশনে সম্প্রচারিত রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করা হয়, যা সাংবিধানিক সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে গণভোটের অপেক্ষায় রয়েছে।
এসব সংস্কার নতুন শাসনব্যবস্থার পথে প্রথম ধাপ। তবে ১৬ বছরের ক্ষতি ১৮ মাসে পূরণ করা সম্ভব নয়। তবুও বাংলাদেশ কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে দৃঢ়ভাবে সরে এসেছে।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে রাজপথে যে সাহসিকতা দেখা গেছে, সেই চেতনাই গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথনির্দেশক হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করা হয় বিবৃতিতে।


