মাত্র ১২ দিনে ভারতের আটটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘এক্সক্লুসিভ’ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। প্রশ্নোত্তরভিত্তিক এসব সাক্ষাৎকারকে প্রত্যেক গণমাধ্যমই নিজেদের ‘বিশেষ’ বলে দাবি করলেও আদতে এগুলোর প্রশ্ন ও তথ্য-উপাত্ত প্রায় অভিন্ন।
ভারতের সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন আউটলুকের এক প্রতিবেদনে সাংবাদিক এসএনএম আবদি প্রশ্ন তুলেছেন, এসব সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনাকে কেন দেশ ছাড়া বা পালিয়ে ভারত চলে যাওয়ার মতো বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়নি। কেন কোনো সাক্ষাৎকারেই শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা এবং তার রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো প্রশ্ন করা হয়নি তা নিয়েও।
এসএনএম আবদি বলছেন, এসব সাক্ষাৎকারে সেসব বিষয়ই উঠে এসেছে সেগুলো শেখ হাসিনা বলতে চান বা মৃত্যুদণ্ডের রায়ের আগে তার লবিস্ট প্রতিষ্ঠান যে বয়ান দাঁড় করাতে চায় সেটি। কোনো সাংবাদিক অবধারিত প্রশ্নগুলোও করেননি। এমনকি গত ১৬ মাস ধরে তিনি কোথায় আছেন, সেটিও কেউ জানতে চায়নি।
এই সাক্ষাৎকারগুলো শেখ হাসিনাকে তার বয়ান যাচাই-বাছাই ছাড়াই তুলে ধরার সুযোগ দিয়েছে বলেও মনে করেন আউটলুকের এই ডেপুটি এডিটর।
তিনি বলেন, এমন এক সময় একযোগে ভারতের গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার এসব সাক্ষাৎকার ছাপা হলো যখন গণহত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) তাকে মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এসব মামলায় শেখ হাসিনা মৃত্যুদণ্ড পাবেন তা প্রত্যাশিত ছিল উল্লেখ করে রায় ঘোষণার আগে মাত্র ১২ দিনে একযোগে এসব সাক্ষাৎকার প্রকাশকে সাদাচোখে দেখতে নারাজ সাংবাদিক আবদি।
ভারতে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য হিন্দুস্তান টাইমস, দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস; দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা; এনডিটিভি অনলাইন এবং প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া (পিটিআই) প্রত্যেকেই দাবি, সাক্ষাৎকারটি ‘বিশেষ’।
যদিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন এবং উত্তরগুলো ছিল মোটামুটি অভিন্ন। যেন সবগুলো উত্তর ‘একই কাপড় থেকে কেটে বসানো হয়েছে!’
এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে, কোনো সংবাদমাধ্যমই সরাসরি শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলে সাক্ষাৎকার ছাপেনি। প্রত্যেকেই লিখিত প্রশ্ন পাঠিয়েছিল, শেখ হাসিনাও লিখিত জবাব দিয়েছেন। ফলে আসলেই তিনি এসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন কিনা, সেটি কেউ নিশ্চিত করতে পারেনি। এমনকি তিনি এ মুহূর্তে দিল্লির কোন গোপন আস্তানায় আছেন, সেটিও সবার অজানা।
দ্য হিন্দু, দ্য হিন্দুস্তান টাইমস এবং দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একই দিনে গত ৭ নভেম্বর শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া প্রকাশ করার একদিন পরে ১৩ নভেম্বর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং আনন্দবাজার পত্রিকা তার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। অন্যদিকে এনডিটিভি অনলাইন এবং দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া তাদেরটি প্রকাশ করে ১৭ নভেম্বর।
গত বছর ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন শেখ হাসিনা।
৭৮ বছর বয়সী বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুদণ্ডের ঠিক আগে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সম্মিলিত কভারেজ নিঃসন্দেহে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সেই সঙ্গে এর বক্তব্য পৌঁছেছে লাখো মানুষের কাছে।
সাংবাদিক আবদি বলছেন, ‘এটি অবশ্যই সুপরিকল্পিত ছিল এবং এর পেছনে বিশাল অর্থ ব্যয় হয়েছে।’
তবে সাংবাদিকরা অর্থ বা ঘুসের বিনিময়ে এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, সে অভিযোগ তুলছেন না আবদি।
তিনি বলেন, বরং শেখ হাসিনার জনসংযোগ-লবিস্ট সংস্থা মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার আগে একটি নির্দিষ্ট বয়ান তৈরি করতে এই পুরো প্রচারের নিপুণ পরিকল্পনা করেছিল। আর ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো সেই পরিকল্পনা সফল করতে সাহায্য করেছিল।
শেখ হাসিনার এসব সাক্ষাৎকারের সঙ্গে তার বিরোধ নেই উল্লেখ করে আউটলুকের ডেপুটি এডিটর বলেন, ‘হাসিনাকে তার কথা বলার সুযোগ দেওয়ার আমি মোটেও বিরোধী নই। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে তার সাধ্যমতো করেছেন। এসব সাক্ষাৎকারে গণহত্যার দায় অস্বীকার করেছেন তিনি, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে দোষারোপ করেছেন; বহিরাগত শক্তির সহায়তায় ক্ষমতা দখলের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসকে তীব্র আক্রমণ করেছেন; ঘোষণা করেছেন যে তার অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের হিন্দুরা অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে; জামায়াত-ই-ইসলামীর পুনরুত্থানের কারণে বাংলাদেশে ইসলামিক উগ্রবাদের উত্থান সম্পর্কে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন পশ্চিমকে সতর্ক করেছেন এবং তাকে কেবল নিরাপদ আশ্রয় দেওয়াই নয়, তার পাশে দৃঢ়ভাবে থাকার জন্য নয়াদিল্লিকে অনেক ধন্যবাদ দিয়েছেন।’
শেখ হাসিনার বক্তব্য হিসেবে এ পর্যন্ত ঠিক থাকলেও সাক্ষাৎকারগুলোকে সাংবাদিকতার জন্য বড় কলঙ্ক হিসেবে দেখছেন এসএনএম আবদি।
তিনি বলেন, ‘তারা সুস্পষ্ট প্রশ্নগুলো জিজ্ঞাসা করেনি। যেসব প্রশ্ন করা জরুরি ছিল, যেসব প্রশ্ন সাংবাদিকতা ও বিজ্ঞাপন বা জনসংযোগের কাজের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে, সেই প্রশ্নগুলোই তারা করেননি।’
শেখ হাসিনাকে প্রশ্ন করার ‘সোনালী সুযোগ’ পেয়েও ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো তা হারিয়েছে বলেও মনে করেন এই সাংবাদিক।
তিনি মনে করেন, আরও বেশকিছু প্রশ্ন অবশ্যই করা প্রয়োজন ছিল।
সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে ভারতে প্রবেশে সবুজ সংকেত কে দিয়েছিল? তিনি নিজেই নয়াদিল্লির কাছে এসওএস পাঠিয়েছিলেন কিনা, নাকি ভারত থেকে কেউ সংকেত দিয়েছিল?
এসএনএম আবদি বলেন, নরেন্দ্র মোদী, এস জয়শঙ্কর এবং অজিত ডোভাল কি শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন কিনা কিংবা তারা কী ধরনের আশ্বাস দিয়েছেন, সে প্রশ্নও করা উচিত ছিল।
কীভাবে ভারতে থাকার সাময়িক অনুমোদন ১৬ মাসে দীর্ঘায়িত হলো, সেই প্রশ্নও করা উচিত ছিল বলেন মনে করেন এই সাংবাদিক।
এছাড়া শেখ হাসিনা ভারত থেকে অন্য কোনো দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অনুমতির অপেক্ষা করছেন কিনা, তিনি যুক্তরাজ্যের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য যোগাযোগ করেছিলেন কিনা; এসব প্রশ্নেরও উত্তর জানতে চাওয়া সম্ভব ছিল।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনাবিরোধী ঢেউ যখন তুঙ্গে তখন ভারত তাকে কী পরামর্শ দিয়েছিল, সে প্রশ্নটিও করা উচিত ছিল বলে মনে করেন আবদি।
তাছাড়া, দেশ ছাড়ার সময় শেষ আধঘণ্টায় কী হয়েছিল, শেখ হাসিনা তার পোষা প্রাণীদের কী অবস্থায় রেখে এসেছিলেন তা জানতে চাওয়া যেত। প্রশ্ন করা যেত, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব হত্যার পর আর এখনকার নির্বাসনের মধ্যে তুলনা সম্পর্কে, দিল্লিতে দিন কেমন কাটছে সে সম্পর্কে; এমনকি এই বয়সে এসে দিল্লির দূষণের সঙ্গে তিনি কীভাবে মানিয়ে নিচ্ছেন, তাও প্রশ্ন করা যেত।
এসএমএম আবদি মনে করেন, একজন শিক্ষানবিস প্রতিবেদকের মাথাতেও এসব প্রশ্ন আসা উচিত ছিল। কিন্তু বহুবছর ধরে পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিবেদন করা অভিজ্ঞ সাংবাদিকরাও তা করেননি। অথচ তারা জানেন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি।
ভারতে একযোগে তার সাক্ষাৎকার প্রকাশের পর ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার পবন বাধেকে তলব করে প্রতিবাদ জানায় ঢাকা। বাংলাদেশের অভিযোগ, পলাতক হওয়ার পরেও শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমকে যোগাযোগ করতে সহায়তা করেছে নয়াদিল্লি।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের মুখপাত্র প্রেস সচিবও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নেওয়াদের ‘ভারতীয় চাটুকার’ সাংবাদিক বলে আখ্যায়িত করেন। এই মন্তব্যের জেরে প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়া শফিকুল আলমকে ক্ষমা চাইতে বলে।
নিকারাগুয়ার সাংবাদিক ফ্যাব্রিচ লে লুস মনে করেন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্ব সাংবাদিকতার মূল হাতিয়ারগুলোর মধ্যে অন্যতম। তাকে মনে রাখতে হবে, এই ব্যক্তিকে সামনে পেলে কৌতূহলী পাঠক কী জানতে চাইতেন? সেই ভাবনা থেকেই সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন তৈরি করতে হবে। আর তাহলেই ওই সাক্ষাৎকারটি গুরুত্ব পাবে, প্রশ্নকর্তা ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠতে পারবেন এবং সাক্ষাৎকারটি ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদদের জন্য দলিল হয়ে উঠতে পারে।
এসএনএম আবদি মনে করেন, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারগুলো বিব্রতকর, অপর্যাপ্ত এবং এতটাই তোষামোদপূর্ণ যে সেগুলোকে ভুলে যাওয়াই ভালো।


