সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একজন ভবঘুরে বৃদ্ধের ‘জোর করে চুল কাটার’ ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর এ নিয়ে সর্বত্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, সাদা পাঞ্জাবি ও পাগড়ি পরা দুই-তিনজন ব্যক্তি ভবঘুরে শ্রেণির একজন খালি গায়ের বৃদ্ধকে ‘জোর করে চুল কেটে’ দিচ্ছেন। বেশ কয়েকজনকে এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে দেখা গেলেও বৃদ্ধের আহাজারি ও প্রতিবাদে কাউকে সাড়া দিতে দেখা যায়নি।
তৎক্ষণিকভাবে ঘটনাটি কোন এলাকার তা জানা যায়নি। এ বিষয়ে এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি।
‘কার কাছে বিচার চাইবেন?’
সাংবাদিক আরিফুজ্জামান তুহিন ভিডিওটি শেয়ার করে সংক্ষিপ্ত নোটে লিখেছেন, ‘কার কাছে বিচার চাইবেন?’
‘এই ভিডিওটা আমি টেনে দেখেছি; বিশ্বাস করেন — সত্যি বিশ্বাস করেন — সাহস হয়নি প্রতিটি সেকেন্ড দেখার। অথচ নিজেকে একসময় খুব সাহসী মনে হতো।’
‘কত টিয়ারসেল, কত পুলিশের লাঠিচার্জ সহজে হজম করেছি। এক সময় সশস্ত্র বিপ্লবের স্বপ্ন দেখতাম। এখন এসব কিছু দেখি না। এখন দেখি, এই যে পাগলপ্রায় একজন অশীতিপর বৃদ্ধ — তার চুল কেটে দিচ্ছে কিছু মানুষ; চুল কেটে দিয়ে তাকে একসাথে নামাজ পড়ার আহবান জানাচ্ছে।’
‘কে বেহেশতে যাবে, আল্লাহ; কে দোজখে যাবে — তার বিচারের ভার কেউ কাউকে দেয়নি। কিন্তু বিচার আমরা করছি: “আমার বাউলের চুল কেটে তাকে মুসলিম বানাচ্ছি।” তিনি কি বলেছেন যে তিনি আপনার তরিকার?
এই বৃদ্ধের ওপর এই অপমান, এই নির্যাতন সত্যিই নিতে পারছি না। সত্যিই না’, বলেন তুহিন।
‘এই উগ্রতা বন্ধ হোক’
ওই ভিডিও পোস্টটি বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটা পর্যন্ত শেয়ার হয়েছে সাড়ে তিন হাজার। এতে নিন্দা ও প্রতিবাদ সূচক মন্তব্য এসেছে এক হাজারের বেশি। কান্নাসূচক ও রাগান্বিত ইমো এসেছে প্রায় চার হাজার।
মন্তব্যের ঘরে তিশা নুরি নামে একজন লিখেছেন, ‘এই ভণ্ড পীর গুলো ইবাদত করা বাদ দিয়ে কি ভণ্ডামি শুরু করেছে? ওদের হাতে এত সময় কিভাবে আসে ইবাদত করা বাদ দিয়ে?’ তারেক রহমান নামে আরেকজন বলেন, ‘দেশ হয়ে গেছে পুরাই পাকিস্তান এর মত…সবখানে ধর্মের নামে অত্যাচার।’ আহনা ইসলাম অনির মন্তব্য ‘আল্লাহ জমিনে তুমি এদের বিচার কইরো।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন ওই ভিডিও থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট দিয়ে ফটোপোস্টে লিখেছেন, ‘খুব লজ্জিত। খুব আতংকিত।’
‘একজন মানুষকে ধরে চুল কেটে দেওয়া হচ্ছে। এটা শুধু ধর্মীয় মৌলবাদের প্রশ্ন নয়, একই সাথে ক্ষমতার প্রশ্ন। শ্রেণিপ্রশ্ন।’
‘এই উগ্রতা বন্ধ হোক। এসব আর কত দেখতে হবে,’ প্রশ্ন অধ্যাপক কাবেরী।
প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ কবিতা লিখে প্রতিবাদ করেছেন ওই ঘটনার। ‘শহরে বন্দি খোয়াজ খিজির’ শিরোনামের দীর্ঘ কবিতার শুরুতে সাংবাদিক ফারুক লিখেছেন. ‘সময়ের দেবতাকে দেখেছি সেদিন/বাতাসের কোঠাঘরে বসে আছে ঠায়,/কোথায় সান্ত্বনা, কোথায় রহম বলে/
ঝাঁপিয়ে পড়েছে ভোরে—ফাঁকা ইঁদারায়।’…
লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট ফিরোজ আহমেদ দীর্ঘ ফটোপোস্টের শুরুতে বলেন, ‘…দিলশানার খবরদারির হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেই বলা দরকার, এই হিংস্রতাগুলো সদ্য শুরু হয়নি। সর্বদাই আছে। তবে ৫ অগাস্টের (২০২৪) পর এগুলোর বাড়াবাড়ি দেখে দঙ্গল (মব) বিষয়ক দুশ্চিন্তাটা প্রথম মাথায় আসে। পরিস্কার বুঝতে পারি যে, কোন একটা ধরনের রাজনৈতিক আদর্শ সহীহ ইসলামের নাম করে এই পদ্ধতিতে নিজেদের রাজনীতির ঘোট পাকাবে।’…



