সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের বনানী শাখা থেকে ২০১৩ সালে ১০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন জয় ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক। লক্ষ্য ছিল সফল একটি আমদানি–রপ্তানি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো। কিন্তু তিন বছরের মাথায় সেই স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।
ব্যাংকের যে কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে তার পণ্যগুলো থাকতো, তিনি গুদাম থেকে ৬ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের মালামাল বিক্রি করে দেন। এতে তার আমদানি পণ্যের সঙ্গে ব্যবসাও উধাও হয়ে যায়।
ব্যাংকটির ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মো. নাজমুস সাদাত বলেন, ‘ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে ওই শাখা ব্যবস্থাপক সৈয়দ সিদ্দিক ইমাম দোষী সাব্যস্ত হন এবং চাকরি হারান।’
কিন্তু এতে কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি ওই উদ্যোক্তা। বিপুল সুদের চাপে ঋণ রয়ে গেছে ঋণের জায়গায়, কিন্তু থমকে গেছে ব্যবসায়িক জীবন। যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছেন, তার থেকে বেশি শোধ করে এখনো ব্যাংকের দায় রয়ে গেছে কয়েকগুণ।
এখনো এই উদ্যোক্তা ঋণের পুরোনো কাগজগুলো হাতে নিয়ে এক কর্মকর্তা থেকে আরেক কর্মকর্তার কাছে ঘুরে বেড়ান। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শাটার বন্ধ, ব্যাংক হিসাব স্থবির, আর তার অভিযোগ শোনার কেউ নেই।
তিনি একা নন। দেশের নানা প্রান্তে শত শত উদ্যোক্তার কণ্ঠে শোনা যায় একই বেদনা – যে ব্যাংক তাদের ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দেওয়ার কথা, তারাই কখনো কখনো ভেঙে দেয় আস্থা।
অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, ‘এ ধরনের অনিয়ম ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও তদারকির দুর্বলতারই প্রতিফলন।’
ব্যাংকাররা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বারবার পরিদর্শন ও তদন্ত সত্ত্বেও খুব অল্প সংখ্যক দোষী কর্মকর্তাই শাস্তি পান। এতে কিছু কর্মকর্তা আবারও একই অনিয়ম করার সাহস পান।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘অনেক রপ্তানিমুখী কারখানা ব্যাংকের অনীহার কারণে উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।’
টাইমস অব বাংলাদেশ-এর কয়েকটি কেস স্টাডিতে উঠে এসেছে, ব্যাংকের খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত, অস্বচ্ছ নীতিমালা আর অবহেলায় অনেক ব্যবসায়ী ধ্বংস হয়েছেন।
বিজিএমইএ বলছে, শুধু ব্যাংক সংক্রান্ত জটিলতায় গত কয়েক বছরে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বহু নিটওয়্যার কারখানা রপ্তানিকারক থেকে সাব-কন্ট্রাক্টরে পরিণত হয়েছে।
ঢাকার এক শীর্ষ শিল্পোদ্যোক্তা জানান, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক থেকে ৮০ কোটি টাকার ঋণসহ একটি কারখানা কিনেছিলেন। ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা অতিরিক্ত মূলধনের আশ্বাস দিয়েও পরে কথা রাখেননি। এতে মাঝপথে ভেঙে পড়ে প্রকল্প।
তিনি ইতোমধ্যে ৮০ কোটি টাকা শোধ করেছেন, তারপরও ফুলে-ফেঁপে সুদসহ ঋণ দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটির কাছাকাছি।
ধামরাইয়ের অরবিট ফ্যাশন নামের একটি মাঝারি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ঋণ সুবিধা হারায় যখন ব্যাংক হঠাৎ তৃতীয় পক্ষের বন্ধক (মর্টগেজ) নেওয়া বন্ধ করে দেয়। নিজস্ব জমি না থাকায় কারখানাটিতে রাতারাতি ব্যাংকের অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যায়। তাতে উৎপাদন বন্ধ, কার্যাদেশ বাতিল, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মুখে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি সাব-কন্ট্রাক্টরের ভূমিকায় নামে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান বলেন, ‘ব্যাংক চাইলে ভালো গ্রাহককে ব্যবসার ট্র্যাক রেকর্ড দেখেই জামানত ছাড়া ঋণ দিতে পারে।’
সিটি ব্যাংকের এমডি ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন বলেন, ‘জমি–বাড়ির ওপর নয়, ঋণ নির্ভর করবে ব্যবসার সামর্থ্যের ওপর। ঋণের প্রকৃত জামানত হচ্ছে ব্যবসাটাই।’
ঋণগ্রহীতারাও দায়ী
অবশ্য ব্যাংকারদের দাবি, ব্যাংক আর গ্রাহকদের এই আস্থাহীনতা একতরফা নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে ইতোমধ্যে তিন হাজার চারশ’রও বেশি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির তালিকা গেছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫০ জন হাইকোর্টে আপিল করেছেন তাদেরকে ইচ্ছাকৃত খেলাপির তালিকা থেকে বাদ দিতে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আগে প্রভাব–পরিচয়ে ঋণ দেওয়া হতো। এখন শৃঙ্খলা ফেরানোর চেষ্টা চলছে।’
তবে অনেক ব্যাংকার স্বীকার করেন, বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো এখনো রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে খেলাপি তকমা এড়াচ্ছেন।
সাউথ বাংলা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম ফারুকের ভাষায়, ‘খারাপ ঋণ যেমন আস্থাহীনতার ফল, তেমনি বাড়তি খেলাপি আবার ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্ক ও ঋণ প্রদানে অনাগ্রহী করে তোলে।’
২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। অনুমান করা হচ্ছে, বছরের প্রথমার্ধ শেষে তা ছয় লাখ কোটি ছাড়াতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মো. মাজেদুল হক বলেন, ‘স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভয় ও তোষামোদের রাজনীতি না বদলালে আর্থিক খাতে আস্থা ফিরবে না।’


