সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে সুবিধাভোগী নির্বাচন, ব্যাংকঋণের ওপর সরকারের নির্ভরতা কমানো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে ডিজিটাল নজরদারির মতো সংস্কার উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘সিপিডি বাজেট ডায়ালগ ২০২৬’-এ তিনি বলেন, সীমিত সময়ের মধ্যে প্রণীত বর্তমান বাজেট নিখুঁত না হলেও সরকার অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, সুবিধাভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট’ (পিএমটি) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির অর্থ সরাসরি পরিবারের নারীর ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হচ্ছে, যাতে কোনো ধরনের লিকেজ বা মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ না থাকে।
আমির খসরু বলেন, বর্তমান সরকার বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বকেয়াসহ বিভিন্ন আর্থিক দায়ভার পেয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমে আসায় অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজে বের করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
মন্ত্রী জানান, চলতি বাজেটে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় করা হচ্ছে। শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে উল্লেখ করে তিনি মানসম্মত শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
স্বাস্থ্য খাতে ইউনিভার্সাল হেলথকেয়ার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান।
তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য স্টার্টআপ, এসএমই, কনটেন্ট ক্রিয়েশন ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক আয় দেশে আনার প্রক্রিয়া সহজ করতে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত লেনদেনে অতিরিক্ত ফরম পূরণের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে।
জ্বালানি খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট নিরসনে অন্তত ১৮ মাস সময় প্রয়োজন হবে। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শক্তিশালী ইন্টারনেট অবকাঠামো অপরিহার্য।
সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালুর ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
তিনি জানান, পূর্ববর্তী সরকারের কাছ থেকে পাওয়া প্রায় ১ হাজার ৩০০ প্রকল্পের অনেকগুলো এখন পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সৃজনশীল অর্থনীতিকে নতুন প্রবৃদ্ধির খাত হিসেবে উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ কর্মসূচির আওতায় কারুশিল্পী, তাঁতি ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তাদের মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করা হচ্ছে। এ খাতে ইতোমধ্যে ৮০০ কোটি টাকার তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসা সহজীকরণ ও কর সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম পৃথক করা হচ্ছে। একইসঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের বাইরে অন্যান্য খাতে রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগাতে বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও কাঠামোগত সংস্কারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের ধীরগতি, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা এবং রাজস্ব আহরণের চ্যালেঞ্জের মধ্যে বাজেট বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে।
তিনি বলেন, বাজেটে মানব উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বেসরকারি খাতের বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, বর্তমান সরকার এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে।
তিনি জানান, ঋণনির্ভরতা কমানো, পরিচালন ব্যয় হ্রাস করে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো এবং কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করার লক্ষ্যে নীতিগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
সাকি বলেন, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে শ্রমিক, কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান ও কর্মসংস্থান খাতে গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ সহজ করতে ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে সেবা প্রদানের লক্ষ্য নিয়ে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাঁচটি গ্যাস অনুসন্ধান রিগ কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা বাড়াতে এডিপির আওতাধীন প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব ও ব্যয় বৃদ্ধি রোধে ‘পিডি পুল’ গঠন এবং বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি নাগরিক পরিচয়, ব্যাংক হিসাব ও টিআইএনকে একীভূত করে ‘ওয়ান সিটজেন, ওয়ান নাম্বার, ওয়ান ওয়ালেট’ কাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে, যাতে অপচয় ও দুর্নীতি কমিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, যোগ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের গুণগত মান, স্বচ্ছতা এবং কাঠামোগত সংস্কার কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর।


